বিজ্ঞাপন
মালয়েশিয়ায় কর্মী হওয়ার যোগ্যতা টাকা নাকি দক্ষতায়?
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২১ এএম
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান শ্রমিক নিয়োগকারী দেশ মালয়েশিয়া। দেশটির নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা ও প্ল্যান্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। দক্ষতা, পরিশ্রম ও উৎপাদনশীলতার কারণে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু বিদেশে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীর যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে অর্থ দেওয়ার সক্ষমতাই বড় হয়ে উঠছে কি না, সেই প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে।
অভিবাসন ব্যয় নিয়ে অনিয়ম, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ।
দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার শ্রমবাজার চালু ও বন্ধ হলেও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। এবারও শ্রমবাজার পুনরায় সচল হওয়ার প্রেক্ষাপটে কর্মী পাঠানোর খরচ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট উৎস দেশ, অনুমোদিত খাত ও নিয়োগসংক্রান্ত শর্ত রয়েছে। কোন দেশের কর্মীরা কোন খাতে কাজ করতে পারবেন, সেটিও নির্ধারিত।
অন্যদিকে, বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতিও গ্রহণ করেছে মালয়েশিয়া। ফলে এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু কর্মী পাঠানো নয়, বরং দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
খরচ ৪০ হাজার, নাকি ৭-৮ লাখ টাকা?
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয়ই সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব সামনে এনে প্রশ্ন উঠেছে, একজন কর্মীকে বিদেশে যেতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে কেন?
প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, কর্মীর পাসপোর্ট, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সদস্য ফি এবং রিক্রুটিং এজেন্সিসংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় খরচ ৪০-৪৫ হাজার টাকার মধ্যে থাকার কথা বলে দাবি করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে অনেক কর্মীকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য ৪-৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যয় ৭-৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে—এমন প্রচারও চলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন কর্মীকে যদি বিদেশে চাকরি পেতে ৭-৮ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেই অর্থের হিসাব কোথায়? কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার স্বচ্ছ বিবরণ কেন থাকবে না? সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব খরচের এত বড় ব্যবধান কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে অনেক কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাদের উপার্জনের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়। এতে কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি শ্রম শোষণ ও মানব পাচারের ঝুঁকিও বাড়ে।
বারবার বন্ধ হয়েছে শ্রমবাজার
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ইতিহাসে একাধিকবার ছন্দপতন ঘটেছে। ২০০৮ সালে নিয়োগ বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হয়। পরে ২০১৮ সালে আবারও নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ২০২২ সালের আগস্টে কর্মী যাওয়া পুনরায় শুরু হয়। তবে ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে আবারও কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে পড়ে।
প্রতিবারই নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সমস্যা সমাধানে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
মালয়েশিয়ার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশটির উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি হয়। ফলে শ্রমিক নিয়োগে মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম ও শ্রম শোষণের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব পড়ে দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও। অতীতে শ্রম অধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে মালয়েশিয়ায় উৎপাদিত কিছু পণ্যের বিরুদ্ধে বিদেশে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগে দুই দেশের সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সংশ্লিষ্ট অনিয়ম বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সমস্যা; তা সমাধানের দায়িত্ব বাংলাদেশেরই।
সরকারি উদ্যোগ, কিন্তু ব্যয়ের স্বচ্ছতা কোথায়?
জানা গেছে, বর্তমান সরকার অভিবাসন ব্যয় ও কর্মী নিয়োগের অনিয়ম নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রিক্রুটিং এজেন্সি, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশে ভিসা বা কর্মী চাহিদাপত্র সংগ্রহ, বিদেশে প্রতিনিধি কার্যালয় পরিচালনা এবং অন্যান্য নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয়ের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এজেন্সিগুলোর দাবি, দেশভেদে এসব খাতে কর্মীপ্রতি ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
অন্যদিকে, বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আইএলও কর্মীর দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ ব্যয়কে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে এসব ব্যয়ের কোনটি নিয়োগকর্তার বহন করার কথা এবং কোনটি কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার সুস্পষ্ট হিসাব ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা কর্মীদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্তে সরকার নির্ধারিত প্রায় ৭৯ হাজার টাকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কর্মীর কাছ থেকে ৬-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি সার্বিয়ায় যাওয়ার জন্য অর্থ দিয়ে অপেক্ষায় থাকা কর্মীদের একাংশের সঙ্গে আলোচনা করে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই কর্মী সংগ্রহ করা এবং কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার পর নিজেদের দায় এড়াতে তাদের মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কর্মীদের টাকা ও পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কাছে আটকে থাকার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অনিয়মের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অর্থ পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে আদালতে মামলাও চলছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যোগ্য কর্মী বাছাইয়ের ব্যবস্থা কোথায়?
বিদেশে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই নীতির কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকারি ডাটাবেজ থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডাটাবেজ তৈরি ও কার্যকর না থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বলেন, আমরা জানি, আগে সরকারের ডাটাবেজ থেকে কর্মী নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু সেখানে তো কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মী নির্বাচন করতে হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ডাটাবেজ থেকে কর্মী নেওয়া হচ্ছে না, আবার উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি দিয়েও প্রার্থী নির্বাচন করা হচ্ছে না। বরং বেশি টাকা দিতে সক্ষম ব্যক্তিরাই সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাল করার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন।
ওই এজেন্সি মালিকের ভাষ্য, নিয়ম মেনে কর্মী পাঠাতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও অনিয়মের দায়ে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তার মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিয়ম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না করে শুধু এজেন্সিগুলোকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মী নির্বাচন থেকে শুরু করে নিয়োগকর্তার চাহিদা যাচাই এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষতার বদলে অর্থের প্রভাব
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর গবেষণায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়কে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি অধিক মুনাফার আশায় নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী যোগ্য কর্মী না পাঠিয়ে অদক্ষ কর্মী পাঠায়। কোথাও কোথাও যোগ্যতার ভুয়া নথি তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
এতে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের কাছে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা ও নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোর পরিবর্তে বাংলাদেশ যদি কয়েকটি শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ওকাপের গবেষণায়ও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নির্দিষ্ট কিছু শ্রমবাজারের ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো গন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ কর্মী তৈরিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কাজ করতে যেতে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে, সিপিডির গবেষণায় সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও বিদেশে কাজ না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগ ও গবেষণার তথ্য সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের পরও যদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে বিদেশে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থের প্রভাব কতটা কার্যকর হয়ে উঠেছে?
বাংলাদেশকে পেছনে ফেলছে ইন্দোনেশিয়া?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান শক্তিশালী হলেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা ৮ লাখ ৩ হাজারের বেশি ছিল। একই সময়ে ইন্দোনেশীয় কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৪৩ হাজার।
তবে মালয়েশিয়ায় ইন্দোনেশীয় কর্মী নিয়োগের প্রবণতায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে ইন্দোনেশীয় কর্মী নিয়োগের সংখ্যা ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৭২ হাজার ২৫৭ থেকে ৫১ হাজার ৭২৩-এ নেমে আসে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতার কারণে দেশটির কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় নিয়োগকর্তা বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজছেন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মীর ভিসা, বিমান টিকিটসহ নিয়োগের যাবতীয় খরচ নিজেরা বহন করে, তাদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ইন্দোনেশিয়া থেকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াকে তুলনামূলক দ্রুত ও স্বচ্ছ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিয়োগনীতি, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং কর্মী সরবরাহের সক্ষমতার ওপর।
তবু বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তাটি স্পষ্ট। নিয়োগপ্রক্রিয়ার জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের সমাধান না হলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
মালয়েশিয়ারও লাভ হবে স্বচ্ছ নিয়োগে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মালয়েশীয় মানবাধিকারকর্মী বলেন, বাংলাদেশ থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে আসা কর্মীদের কারণে দেশটির কয়েকটি কোম্পানি সমস্যায় পড়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কিছু কোম্পানিকে কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তার মতে, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা কর্মীর ওপর চাপানো হলে তা শুধু বাংলাদেশের কর্মীদের ক্ষতি করে না, মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদেরও ঝুঁকিতে ফেলে। শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।
তিনি মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের বাংলাদেশের সরকারি ডাটাবেজ থেকে কর্মী বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, যোগ্য কর্মী নির্বাচন এবং নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে; পাশাপাশি দুই দেশের ভাবমূর্তিও রক্ষা পাবে।
এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। এ জন্য প্রথমেই সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ ও ব্যাপক প্রচার করা জরুরি। কোন খাতে কত টাকা নেওয়া যাবে, কোন ব্যয় নিয়োগকর্তার এবং কোনটি কর্মীর তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি ডাটাবেজ তৈরি ও কার্যকর করে সেখান থেকে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মী নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। উন্মুক্ত নিয়োগপ্রক্রিয়া, চাহিদাপত্র যাচাই, এজেন্সির ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকার মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে শুধু ১০ হাজার কর্মী নয়, সামগ্রিক নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
আগের সরকারগুলোর সময়ে সংঘটিত অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা বহন করতে গিয়ে কর্মীরা ঋণগ্রস্ত হবেন, যোগ্য কর্মীরা সুযোগ হারাবেন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী হওয়ার শর্ত কি শেষ পর্যন্ত টাকা, নাকি যোগ্যতা এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে বাংলাদেশের নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারের ওপর। কর্মীর দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে যদি নিয়োগের প্রধান ভিত্তি করা যায় এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পথ বন্ধ করা যায়, তবেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য টেকসই শ্রমবাজার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, বিপুল অর্থ ব্যয় করেও বিদেশে চাকরির নিশ্চয়তা না পাওয়া এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে শ্রমবাজার হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।