বিজ্ঞাপন
শতবর্ষী মায়ের আশ্রয় নিয়েও টানাটানি, বুয়েট কর্মকর্তার নামে মামলা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮ এএম
বিজ্ঞাপন
বাবা-মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়া, পৈতৃক বসতবাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি এবং জরাজীর্ণ ঘর মেরামতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ছেলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন শতবর্ষী এক মা।
একইসঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বাবা-মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে ছয় ভাই-বোনকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে তার মেজো ছেলে বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মো. মুখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী মা মোছা. রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা ওরফে রেফুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা মাঝপাড়ার মৃত এসলাম হোসেনের স্ত্রী। সাত সন্তানের জননী রহিমা খাতুন স্বামী মারা যাওয়ার পর বর্তমানে ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, টিনের চালার বিভিন্ন স্থানে ফুটো। বৃষ্টির পানি পড়ে ঘরের ভেতরে।
দেয়াল ও ঘরের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। ঘুণে চালার বিভিন্ন অংশও খসে পড়ছে।
এমন জরাজীর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন শতবর্ষী রহিমা খাতুন।
রহিমা খাতুনের অভিযোগ, সম্পত্তির মালিকানা নিজের নামে নেওয়ার পর থেকেই তার মেজো ছেলে মুখতারুজ্জামান তাকে ও ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেনকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দিয়ে আসছেন। এমনকি বৃষ্টির পানি পড়া ও ফাটল ধরা ঘরটি মেরামত করতে গেলেও তিনি বাধা দিচ্ছেন।
নিজের ও স্বামীর সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার প্রতিকার এবং পৈতৃক বসতবাড়ি রক্ষার দাবিতে ছেলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন রহিমা খাতুন।
এর আগে বিষয়টি নিয়ে গ্রাম্য সালিশ, থানায় এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে জানান তিনি।
রহিমা খাতুনের অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার কথা বলে তার ও স্বামীর কাছ থেকে টিপসই নেন মুখতারুজ্জামান। পরে সেই টিপসই ব্যবহার করে পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন তিনি।
রহিমা খাতুন বলেন, তার শেষ আশ্রয়টুকুও এখন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। ছেলে যেন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে না পারেন, সে কারণেই বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
রহিমা খাতুনের ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন জানান, তার বাবা-মায়ের প্রায় ১২ বিঘা ধান ও আমের জমি এবং বসতবাড়ি মুখতারুজ্জামান নিজের নামে লিখে নিয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ। অথচ এখন তিনি মায়ের দেখাশোনা করেন না।
ইসমাইল বলেন, তিনি দিনমজুরি করে সংসার চালান। আয় খুবই কম। তারপরও মাকে দেখাশোনা করছেন। জরাজীর্ণ বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় মেরামতের চেষ্টা করলেও তার ভাই তা করতে দিচ্ছেন না। উল্টো বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে মাকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।
রহিমা খাতুনের অপর দুই ছেলে আলিম হোসেন ও খাইরুল হোসেন জানান, তাদের বাবা-মায়ের সাত সন্তানের মধ্যে বাকি ছয় সন্তানকে সম্পত্তি বণ্টন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, মা-বাবাকে ভুল বুঝিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার পরও মুখতারুজ্জামান তার শতবর্ষী মায়ের কোনো খোঁজখবর নেন না। জমি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও তিনি সালিশের সিদ্ধান্ত মেনে নেননি।
তারা বলেন, কোনো উপায় না পেয়ে শেষ বসতভিটা ও অধিকার রক্ষায় তাদের মা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল হক কমল জানান, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হলেও অভিযুক্ত তা মেনে নেননি।
তিনি বলেন, অভিযোগের পর দলিলপত্র দেখে তার কাছে মনে হয়েছে, আইনগতভাবে রহিমা খাতুনের স্বামী জীবিত অবস্থায় সম্পত্তির মালিক ছিলেন এবং বর্তমানে তার ছেলে মুখতারুজ্জামান মালিক। তবে কীভাবে সম্পত্তি তার নামে গেল, তা নিয়ে পরবর্তীতে অন্যান্য সন্তানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, সালিশে মানবিক কারণে জমি ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও মুখতারুজ্জামান তা মানেননি। অন্যদিকে সালিশে রহিমা খাতুন বারবার দাবি করেছেন, তিনি তার কোনো সন্তানকে কোনো সম্পত্তি লিখে দেননি।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. সোহরাব আলী মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট মোছা. রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা ওরফে রেফুল মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে তার মেজো ছেলে মুখতারুজ্জামানকে।
আইনজীবী বলেন, মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মুখতারুজ্জামান তার বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে গিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন। পরে কৌশলে মায়ের কাছ থেকেও টিপসই নিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মো. মুখতারুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কয়েকদিনের চেষ্টায় তার ব্যবহৃত তিনটি ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা গেলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। পরে নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।