বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, চাকরিতে মেধা-যোগ্যতাই প্রধান: হাসনাত আবদুল্লাহ
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১০ এএম
বিজ্ঞাপন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বঞ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়াই প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়াই হবে প্রধান নির্ণায়ক।
হাসনাত আবদুল্লাহর দাবি, এটি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের বিষয় নয়। জুলাই গণআন্দোলন সমাজের প্রচলিত বৈষম্যমূলক সুযোগের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি ‘কমন লেজিটিমেট গ্রাউন্ড’ বা ন্যায্যতার ভিত্তি তৈরি করেছে। জুলাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সুযোগকে দলীয় আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত করা যাবে না।
তিনি বলেন, আজ যদি একজন নাগরিকের যোগ্যতা, পরীক্ষার ফলাফল ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার বাইরে তার রাজনৈতিক পরিচয়কে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, ‘তাহলে জুলাইয়ের সেই সামাজিক ঐকমত্যের কী হলো?’
সরকারি চাকরিতে মূল ভিত্তি কী?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৭(১) ধারায় সরাসরি জনবল নিয়োগের ভিত্তি হিসেবে মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো একটি স্বচ্ছ ও বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যেখানে একজন নাগরিকের যোগ্যতা মূল্যায়িত হবে তার মেধা, দক্ষতা ও আইনসম্মত যোগ্যতার ভিত্তিতে।
যে কেউ যেকোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, আবার কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত নাও থাকতে পারেন।
কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারযোগ্য। তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে, ফৌজদারি অপরাধ না থাকলেও চাকরি বাতিলের মতো শাস্তি সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বৈষম্যমূলক আচরণ।
জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?
জুলাইয়ের আন্দোলনের সূচনালগ্নেই সরকারি চাকরিতে কোটা ও বৈষম্যমূলক সুবিধার প্রশ্নটি সামনে এসেছিল। পরবর্তীতে আন্দোলন বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে বিস্তৃত হয়।
তাই জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় চাকরিতে আবার যদি ‘কে কোন রাজনৈতিক মতের?’—এই প্রশ্নটি যোগ্যতার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি শুধু একটি নিয়োগের প্রশ্ন নয়; এটি জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন।
শুধু নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষকে সুবিধা দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন যোগ্য নাগরিককে বঞ্চিত করাও একই নীতির লঙ্ঘন।
ভেরিফিকেশনের স্বচ্ছতা কোথায়?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার যদি নিয়োগের আগে বা পরে কোনো ভেরিফিকেশন বা তদন্তের ভিত্তিতে একজনকে চাকরি থেকে বাদ দেয়, তাহলে সেই ব্যক্তির জানার অধিকার থাকা উচিত—
ক. কোন আইন বা বিধির অধীনে তার বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে?
খ. কোন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করেছে?
গ. কী ধরনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে?
ঘ. কোন প্রশ্ন বা মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে?
ঙ. তার বিরুদ্ধে কী নির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেছে?
চ. রাজনৈতিক পরিচয় কি সিদ্ধান্তের কোনো অংশ ছিল?
ছ. তাকে কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে?
জ. সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না?
কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড়, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতাও তত বেশি হওয়া উচিত।
তথ্য জানার অধিকার
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের বিধান সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং অনুরোধের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। একই আইনের ৮ ধারায় তথ্য চাওয়ার পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এটাও সত্য যে আইনে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ না করার ব্যতিক্রম রয়েছে। তাই ‘সরকার সব ভেরিফিকেশন তথ্যই প্রকাশ করতে বাধ্য’—এমন সরল দাবি না করে প্রশ্নটা হওয়া উচিত—
‘যে তথ্য আইন অনুযায়ী প্রকাশযোগ্য, সেটি কেন গোপন থাকবে?’
আর যদি কোনো তথ্য প্রকাশযোগ্য না হয়, তাহলে সেই অস্বীকৃতিরও আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া উচিত।
পোস্টের শেষে তিনি বলেন, যাদের চাকরি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে বাতিল বা আটকে দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রথম দাবি হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি, ব্যবহৃত মানদণ্ড এবং প্রযোজ্য নথি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ।
এরপর প্রয়োজন হলে তথ্য ও নথির ভিত্তিতে প্রশাসনিক প্রতিকার, আপিল এবং আদালতের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা।
কারণ জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তার অধিকার ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেবে।