Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

‘মুসলিমা কই, মুসলিমা কই’-সন্তানকে খুঁজতে খুঁজতে মিলল নিথর দেহ

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

‘মুসলিমা কই, মুসলিমা কই’-সন্তানকে খুঁজতে খুঁজতে মিলল নিথর দেহ

বিজ্ঞাপন

সাত বছরের ছোট্ট মুসলিমা। বিকেলে মায়ের অনুমতি নিয়ে প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে খেলতে বের হয়েছিল। তখনও কে জানত, সেই বের হওয়াই হবে তার শেষবারের মতো ঘর থেকে বের হওয়া। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও বাড়ি ফিরছিল না সে। মা লাইলি বেগম বারবার ডাকছিলেন— মুসলিমা কই, মুসলিমা কই? কিন্তু কোনো সাড়া মিলছিল না।

অবশেষে স্বজন ও প্রতিবেশীদের দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর একটি পানের বরজের পাশে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় মুসলিমার নিথর দেহ। গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। আদরের মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে ভেঙে পড়েন বাবা-মা। এ ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে নানা প্রশ্ন—কেন হত্যা করা হলো শিশুটিকে?

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার কোদালিয়া ইউনিয়নের কচুড়িয়া মধ্যপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মুসলিমা ওই এলাকার ইসলাম শেখ ও লাইলি বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

মায়ের কণ্ঠে শুধু ‘মুসলিমা কই’

সন্তান হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মুসলিমার মা লাইলি বেগম। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার মা বিকালে খেলতে গেছিল। সন্ধ্যার একটু আগে দেখি এখনও আসে না। আমি মুসলিমা কই, মুসলিমা কই বলে অনেকবার ডাকছি। কোনো সাড়া দেয় না। দৌড়াইয়া রাস্তায় গেছি। আমার মা তো কখনো রাস্তায় যায় না। সারা বাড়ি খুঁজছি।

তিনি বলেন, একটু পরে অভিযুক্ত রমজানের মা বলে, তোর মেয়েকে কারা ধরে নিয়ে গেছে, তুই মাইকিং কর। এর কিছুক্ষণ পর পানের বরজের পাশে মেয়েটাকে গলা কাটা অবস্থায় পাই।

মেয়ের মরদেহ পাওয়ার পর থেকেই নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা ইসলাম শেখ। স্বজনদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, মেয়ের কানে এক জোড়া স্বর্ণের দুল ছিল, কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের পর তা পাওয়া যায়নি। এ কারণে স্বর্ণের দুলের জন্যই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তার সন্দেহ।

ইসলাম শেখ বলেন, মুসলিমার কানে এক জোড়া স্বর্ণের দুল ছিল। কিন্তু এখন আর তা পাওয়া যাচ্ছে না। আমার সন্দেহ, রমজান দুল খুলে নিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমি মেয়েকে যেভাবে হারিয়েছি, এমন শাস্তি চাই যাতে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।

টাকা চাওয়ার অভিযোগ বাবার

ইসলাম শেখের দাবি, বাড়ি নির্মাণের সময় রমজান শেখ তার কাছে টাকা চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, বাড়ি করার সময় রমজান আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আমি তোকে টাকা দেব কেন? তখন সে বলেছিল, বাড়ি করতেছিস, কিছু টাকা দিবি। আমি কোনো টাকা দিতে পারব না বলেছিলাম।

তবে এই টাকা চাওয়ার ঘটনার সঙ্গে মুসলিমা হত্যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

তিনজন গ্রেপ্তার, একজন পলাতক

স্থানীয়রা জানান, মুসলিমাকে খুঁজতে গিয়ে জাহাঙ্গীর শেখের বাড়ি, পানের বরজ, পুকুর ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে পানের বরজ ও একটি মাছের ঘেরের মাঝামাঝি স্থান থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয়রা জাহাঙ্গীর শেখ (৫৫), তার দুই ছেলে রমজান শেখ (২৩) ও আব্দুর রহমান (১৯)-কে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার দেখায়। জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তেজিত জনতা জাহাঙ্গীরের বসতঘর, পানের বরজ, খড়ের গাদা ও রান্নাঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। রোববার বিকেলেও ওই বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

ধর্ষণের অভিযোগের কোনো আলামত মেলেনি

শিশুটিকে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকজনের সন্দেহ। কেউ কেউ ধর্ষণের পর হত্যার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও অন্যান্য বিষয় আরও স্পষ্ট হবে।

হত্যা মামলা, আদালতের মাধ্যমে কারাগারে

এ ঘটনায় মুসলিমার বাবা ইসলাম শেখ বাদী হয়ে শনিবার রাতে মোল্লাহাট থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, শিশু মুসলিমা হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

আদরের ছোট বোনকে হারিয়ে শোকাহত দুই ভাই-বোন

ইসলাম শেখ ও লাইলি বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে মুসলিমা ছিল সবার ছোট। পরিবারের সবার আদরের এই শিশুটির এমন নির্মম মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছে পুরো পরিবার।

নামাজে জানাজা শেষে রোববার বিকেলে মুসলিমার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ছোট্ট মুসলিমা আর কোনোদিন মায়ের ডাকে সাড়া দেবে না, বিকেলে খেলতে বের হয়ে ছুটে আসবে না বাড়ির উঠোনে। তার চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের মনেই রেখে গেছে গভীর শোক আর একরাশ প্রশ্ন—একটি সাত বছরের শিশুর জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার