বিজ্ঞাপন
জজের কাছে পরামর্শ নিতে গিয়ে প্রেম ও বিয়ে, সেই চৈতী এবার জজ
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
পরামর্শ নিতে গিয়ে পরিচয়। এরপর প্রথম দেখাতেই মুগ্ধতা, সেখান থেকে প্রেম ও বিয়ে। গল্পটা এখানেই শেষ নয়। যে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একসময় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরামর্শ নিতে হয়েছিল, সেই চৈতী বিশ্বাস এবার ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
চৈতীর স্বামী উদাস গোস্বামীও একজন বিচারক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উদাস গোস্বামী ১৬তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এই দম্পতির জীবনে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাইলফলক।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের পথচলা ও চৈতীর বিজেএসে উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প জানিয়েছেন উদাস গোস্বামী।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চৈতীর সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না। তিনি চৈতীর চার ব্যাচ সিনিয়র। জজ হওয়ার পর অনেকেই বিজেএসের প্রস্তুতি নিয়ে তার কাছে পরামর্শ চাইতেন। চৈতীও তাদের একজন ছিলেন।
চৈতীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবার দেখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথমবার দেখা হওয়ার পর আমি এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাই এবং ভালো লেগে যায় যে তখনই ঠিক করে ফেলি, বিয়ে যদি করতেই হয়, তাহলে তাকেই করব।’
প্রথম দেখার সেই অনুভূতির কথা তিনি তার বন্ধু ও সহকর্মী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাইমকেও জানিয়েছিলেন। পরে পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়।
চৈতীর বিজেএসের প্রস্তুতিতে স্বামী উদাস গোস্বামী তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি তাকে অনুপ্রাণিত করতে। আমি সবসময় বলতাম, কোনো কাজ করতে হবে না বাড়ির। সে যেন শুধু পড়ে।’
উদাসের ভাষায়, চৈতী যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা করতে পারেন, সে রকম পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। শুরু থেকেই তার বিশ্বাস ছিল, চৈতী পারবেন।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে রান্না বা ঘরের কাজ করানো মেধার অপচয়। আমি সবসময় চেয়েছি, আমার স্ত্রী তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী অবস্থানে পৌঁছাক।’
চৈতী বিজেএসে উত্তীর্ণ হওয়ার খবর শোনার পর নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়ার কথাও জানিয়েছেন উদাস। তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর যখন সম্বিত ফিরে পাই, তখন দেখি চোখের কোণে জল।’
তিনি জানান, ফল প্রকাশের সময় তিনি জেলা জজের সঙ্গে একটি মিটিংয়ে ছিলেন। পরে তাকে কানে কানে চৈতীর সাফল্যের খবরটি জানান। খবর শুনে জেলা জজও আনন্দিত হন এবং তাদের মিষ্টিমুখ করান।
বিজেএসের প্রস্তুতির সময় চৈতীর বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমস্যার সমাধান করতেন উদাস। তিনি বলেন, কীভাবে সব বিষয় গুছিয়ে পড়তে হয়, তা নিয়ে আলোচনা করতেন। লেখার ধরন ও প্রশ্নের প্যাটার্ন নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো।
কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে চৈতী তা নোট করে রাখতেন। পরে উদাস সেগুলোর সমাধান করে দিতেন। কোনো বিষয় নিজে না পারলে সহকর্মীদের কাছ থেকেও সমাধান জেনে দিতেন।
তবে চৈতীর সাফল্যের পেছনে তার নিজের ধৈর্য ও একাগ্রতাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন উদাস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চৈতীর সাফল্য নিয়ে উদাস লিখেছিলেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই একজন জজ দেখার সৌভাগ্য হবে।’ এর পেছনের অনুভূতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।
উদাস বলেন, গ্রামে বড় হওয়ায় ছোটবেলায় কোনো কাগজপত্র সত্যায়িত করতে আশপাশে কাউকে পাওয়া যেত না। একবার রংপুর আদালতে গিয়ে একজন বিচারকের কাছে কাগজপত্র সত্যায়িত করিয়েছিলেন। সেদিনই একজন বিচারককে সামনে থেকে দেখার এবং তার সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা হয়।
তিনি জানান, তখন একজন বিচারকের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি তার কাছে এতটাই বিশেষ মনে হয়েছিল যে সেই গল্প অন্যদেরও বলতেন। নিজে বিচারক হবেন বা তার স্ত্রীও একদিন বিচারক হবেন, তখন তা কল্পনাও করেননি।
উদাস বলেন, ‘চৈতীর পড়াশোনার ধরন ছিল একেবারেই আলাদা। আমরা দুই জন ‘দুই মেরুর শিক্ষার্থী’। আমি পরীক্ষার আগের রাতে পড়তাম। অন্যদিকে চৈতী নিয়মিত ও রুটিন মেনে পড়াশোনা করতেন।’
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলেও তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন। উদাসের অবস্থান ছিল তুলনামূলক পেছনের দিকে, আর চৈতী ছিলেন সামনের সারিতে।
স্বামী-স্ত্রী দুজনের বিচারক হওয়ার বিষয়টি পরিবারের জন্যও বিশেষ আনন্দের। তবে এই সাফল্যের সময়ে বাবার কথা মনে করে আবেগাপ্লুত উদাস।
বাবা চৈতীকে খুব ভালোবাসতেন উল্লেখ করে উদাস বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার আগের দিনও তিনি বলেছিলেন, আমার বউমা এবার জজ হবেই। বাবার সেই কথার কথা মনে করে তারা সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন।’
চৈতী বিচারক হিসেবে যোগ দিলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই একই পেশায় থাকবেন। উদাস মনে করেন, এতে পেশাগতভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।
আইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়ক হতে পারে। তবে বাড়িতেও আদালতের বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ায় সংসারজীবনে এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি। আবার এতে তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াও আরও ভালো হতে পারে বলে তার বিশ্বাস।