বিজ্ঞাপন
অপ্রতিম হ/ত্যা: পুরোনো ক্ষোভের প্রতিশোধ?
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১১ এএম
বিজ্ঞাপন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদসহ সাত কিশোরকে দেড় বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছিল। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বর থেকে গাঁজাসহ ওই সাত কিশোরকে আটক করা হয়। অভিযানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. নাহিদা বেগমের সঙ্গে দুই সহকারী প্রক্টর মাহমুদুল হাসান রাহাত ও মুতাসিম বিল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে জব্দ করা গাঁজাও পরে ধ্বংস করা হয়।
ওই সময় গণমাধ্যমকে ড. নাহিদা বেগম বলেছিলেন, ‘প্রক্টরিয়াল টিমের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আজ আমরা মাদকসহ এ সাতজনকে আটক করেছি। তাদের ভাষ্যমতে, সবার বয়স ১৮ বছরের কম। ভবিষ্যতে তারা যাতে কোনো বড় অপরাধে জড়িত না হয়, সে জন্য মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের হাতে তাদের হস্তান্তর করা হয়েছে।’
দেড় বছর পর গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ফাহাদও রয়েছে। মামলার তিন আসামি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
এদিকে, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বর থেকে গাঁজাসহ সাত কিশোরকে আটকের একটি ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। ছবিতে থাকা কিশোরদের মধ্যে ফাহাদকেও দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন তৎকালীন সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহ।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এটা ফাহাদ। তারা সবাই মুচলেকা দিয়ে প্রক্টর অফিস থেকে গিয়েছিল। তাদের পরিবারের লোকজনও এসেছিল।’
তবে ফাহাদের মা জুলি আক্তার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘এখানে ফাহাদ নেই।’
জানা গেছে, ফাহাদ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোচালক। ফাহাদ ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ইলেকট্রিকের অফিসে চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ফাহাদ চাকরি নিয়েছিল বলে জানা গেছে। অপ্রতিমের বাবা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দেড় বছর আগে গাঁজাসহ আটক হওয়া সাত কিশোরের মধ্যে থাকা ছেলেটিই ফাহাদ।
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার কারণে তার ছেলেকে টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে বিভিন্ন আইডি থেকে ব্লেইম করা হচ্ছে। আমার ছেলে কিছু বোঝে? আমার দুধের শিশুকে অপরাধী বানাতে চাইলে আমি এটা কখনোই মেনে নেব না।’
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বিচার চাই না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত বাচ্চার জীবন নেবে, কত বাচ্চার জীবন ধ্বংস করবে—সেটা নিয়েও আমি চিন্তিত। আমি চাই, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।’
ড. নাহিদা আরও বলেন, ‘বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে নানা উপায়ে তাকে (অপ্রতিম) ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে আমি অনেক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। ওই ঘটনার কারণে যদি আমার ছেলেকে টার্গেট করা হয়, তাহলে এটা আমি মেনে নেব না।’
তিনি বলেন, ‘আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যদি আমার অপরাধ হয়, তাহলে তার শাস্তি আমি পাব। আমার ছেলে কেন এর শাস্তি পাবে? আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলা হলো? আমার ছেলেকে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেও তাদেরই একজন। অথচ আমার ছেলে নিষ্পাপ, ছোট বাচ্চা। সে এসবের কিছুই বোঝে না।’
এ সময় কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) তারেক আবদুল্লাহ, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শহীদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক খন্দকার ও সাবেক সভাপতি শরীফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।