Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

যে আইন অনুযায়ী বাতিল হতে পারে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৬ এএম

যে আইন অনুযায়ী বাতিল হতে পারে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ

বিজ্ঞাপন

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে সমালোচকদের মাঝে নানান আলোচনা পর্যালোচনা হয়ে গেছে। উদয় হয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের।

নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করে জামায়াত চিঠি পাঠালেই পদটি সরাসরি শূন্য হবে নাকি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে সে নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই। তবে সংবিধান কিংবা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে রাজনৈতিক দল কর্তৃক বহিষ্কৃত হলে সরাসরি এমপি পদ বাতিলের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় ‘সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন-১৯৮০’ অনুসরণ করেই নির্বাচন কমিশনকে গাজী নজরুলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার শর্তাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হলে সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে— আইনে এমন কথা বলা নেই, বরং কোনো সদস্য নিজে পদত্যাগ করলে বা দলের বিপক্ষে ভোট দিলে পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। যেহেতু জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে, তাই সরাসরি ইসিতে চিঠি না পাঠিয়ে এই বিতর্কটি প্রথমে জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট উত্থাপন করতে হবে। সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনো দল চিঠি দিলে কমিশন এই আইনে এককভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন-১৯৮০-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হলে স্পিকার ৩০ দিনের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বিবরণী বা স্টেটমেন্ট প্রস্তুত করবেন। এই বিবরণীতে বিরোধের মূল বিষয়, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের নাম-ঠিকানা এবং যিনি বিরোধটি উত্থাপন করছেন তার বিস্তারিত পরিচয় সংকলন করা হবে। আইনে একে ‘বিরোধের পক্ষসমূহ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এরপর স্পিকার শুনানি ও চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য উক্ত লিখিত বিবরণী নির্বাচন কমিশনের নিকট আনুষ্ঠানিক বিচারিক পর্যালোচনার জন্য পাঠাবেন।

বিবরণীটি ইসিতে পৌঁছানোর পর ৪ ধারার বিধান অনুযায়ী কার্যধারা পরিচালিত হবে। নির্বাচন কমিশন স্পিকারের পাঠানো নোট পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে বিবৃতির একটি হুবহু অনুলিপি বিরোধের উভয় পক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষকে স্ব-স্ব লিখিত বক্তব্য দাখিলের নির্দেশ দেবে। নির্ধারিত সময় শেষ হলে কমিশন একটি নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণ করে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বিচারিক শুনানি পরিচালনা করবে। শুনানিকালে উভয় পক্ষের সশরীরে অথবা অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে নিজ নিজ পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন, তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়া এবং সাক্ষীর জেরা করার পূর্ণ আইনি ক্ষমতা সংরক্ষিত থাকবে।

একই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী এই বিচারিক শুনানির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ‘কোড অব সিভিল প্রসিডিউর-১৯০৮’-এর আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ দেওয়ানি আদালতের সমপরিমাণ বিচারিক ক্ষমতা ভোগ করবে। বিরোধ নিষ্পত্তির স্বার্থে যে কোনো ব্যক্তিকে সমন জারি করে তলব করা, সশরীরে উপস্থিতি বাধ্য করা, শপথ করিয়ে জবানবন্দি গ্রহণ, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব ও উপস্থাপন দাবি করা এবং কমিশন গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষমতা কমিশনের থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় ইসির সামনে পরিচালিত যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ১৯৩ ধারা অনুযায়ী সরাসরি দেওয়ানি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া বা জুডিশিয়াল প্রসিডিং হিসেবে গণ্য করা হয়।

সমগ্র আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়সীমাও আইনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের নিকট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নথি পাওয়ার সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা মতামত স্পিকারের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। শুনানি শেষে কমিশন যদি গাজী নজরুলের সদস্যপদ বাতিলের পক্ষে রায় দেয়, তবে সংসদ সচিবালয় থেকে আইনানুগভাবে সাতক্ষীরা-৪ আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিচারিক ধারাবাহিকতা মূলত সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদের মূল চেতনার আলোকেই বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে।

অতীতের ঘটনা ও ইসির বর্তমান অবস্থান

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতেও এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই আইনের প্রয়োগ করা হয়েছে। ২০০০ সালে তৎকালীন বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামানকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বিষয়টি স্পিকারের কাছে তোলেন এবং পরবর্তী সময়ে স্পিকারের রেফারেন্সে ইসি শুনানি শেষে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল করে। একইভাবে, ২০১৫ সালে হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলে তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ইসিতে পাঠান। পরবর্তী সময়ে ইসির শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই পদত্যাগ করেছিলেন।

এর আগে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জামায়াত থেকে পাঠানো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছিলেন, তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং স্পিকারের মাধ্যমে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক চিঠি ইসিতে পৌঁছালে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার