বিজ্ঞাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে: ফজলুর রহমান
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
‘আমরা ধর্মীয় জাতীয় সত্তায় নয়, আমরা নৃতাত্ত্বিক জাতীয় সত্তায়, ভাষাভিত্তিক জাতীয় সত্তায় দেশ বানাইতে চাই।’ ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে এমন মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফজলুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে, তোমরা এ পথে যেও না। তোমরা জ্ঞান অর্জন করো। পোশাক ও ভাষাই শুধু মানুষের প্রকৃতি নির্ধারণ করে না। পাঞ্জাবি, পায়জামা আর টুপি পড়লেই কেউ আলেম হয় না, আলেম হতে গেলে এলেম জানতে হয়।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে বেহেশত-দোজখের টিকিট বিক্রি করা হয়। আর কেউ কিনতে না চাইলে তাকে খারাপ বানিয়ে দেওয়া হয়। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে রাজনীতি, ধর্ম এবং ধর্ম ব্যবসা এক নয়।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি পাকিস্তানকে ঘৃণা করি না। এখন একটা বিতর্ক তৈরি হইছে-জিন্নাহ নাকি আমাদের দেশ বানায়ে দিছে? না! মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আমি ছোট মনে করি না।’
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সনে জন্মগ্রহণ করছে। ১৯০৯ সালে তিনি বোম্বে থেকে পার্লামেন্ট মেম্বার হইছে।’
জিন্নাহর পারিবারিক পরিচয় প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘তার বাড়ি হলো বোম্বে। সেই গুজরাটের একটা খোজা পরিবারের, যারা মাছ বিক্রি করত... জিন্নাহর বাপ মাছ বিক্রি করত। হি ওয়াজ এ হিন্দু-আমি অশ্রদ্ধা করতেছি না।’
তবে ঐতিহাসিক সূত্রে জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জাকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি পাকিস্তানি সূত্রেও তাঁর পরিবারকে গুজরাটের প্যানেলি গ্রামের মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর ভাষ্য, ‘১৪ দফা দিল, হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি করল, জিন্নাহ একটা পাকিস্তান বানাইলো।’
ঐতিহাসিকভাবে জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯২৯ সালে তাঁর ঘোষিত ১৪ দফায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দাবি ছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি নেতাদের ভূমিকার প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, পাকিস্তান আমরা সবাই মিলেই বানাইছিলাম, আমরা তো অস্বীকার করি না। কিন্তু বানাইয়া যখন দেখলাম পাকিস্তান ভালো না, তখন এটাকে আমরা ৫২ সনেই... ফাইট শুরু করলাম।
তিনি বলেন, ‘৫২ সনে। এবং এটারই পথ ধরে ৫৪-র ইলেকশন, ৫৮-র আইয়ুব খানের শাসন।’ এরপর ছয় দফা, ১১ দফা ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলন এগিয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘সারা পাকিস্তানে মেজরিটি শেখ মুজিবুর রহমান।’ এরপর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স তখন ২৩ বছর। আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। যুদ্ধে যাই নাই শুধু, যুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলাম।’
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘This is not the arms that fights, but the man behind the arms, and ideology behind the man that fights।’
জাতীয় পতাকা ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গান নির্বাচনের সময়কার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধই সত্য। যখন কেউ বলছে “মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই”-এইখানে (বুকে) আমার লাগছে।’
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সত্যের পথে চলো। সত্য কথা বলো। অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্য অন্তত একটা মোমবাতি হলেও হাতে নাও।’
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। উদ্বোধক ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্য সচিব মামুন সরকার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমা। সঞ্চালনা করেন রবীন্দ্র সৃজন কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিন।
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরাম, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে এ নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।