বিজ্ঞাপন
মালয়েশিয়ায় দুই অভিযানে ১৭৪ বাংলাদেশিসহ ৩৩৭ অভিবাসী আটক
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৩ এএম
বিজ্ঞাপন
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের ঘিরে জাল কাগজপত্র তৈরি, ভুয়া ই-পি এল কে এস (অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভ্রমণ অনুমতিপত্র) এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে চাকরির দুটি পৃথক ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটির অভিবাসন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে দুই ঘটনায় মোট ৩৩৭ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭৪ জনই বাংলাদেশি।
একদিকে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের জন্য জাল ই-পি এল কে এস ও জাল পুলিশ প্রতিবেদন তৈরির অভিযোগে ১১ বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সেপাংয়ে উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার নির্মাণ প্রকল্পে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে কাজ করার অভিযোগে ১৭৩ বিদেশি আটক হয়েছেন। দুটি ঘটনাতেই তদন্তের আওতায় এসেছে বিদেশি কর্মীদের বৈধতা, নিয়োগকর্তা ও নথিপত্রের ব্যবহার।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জানান, কুয়ালালামপুরের জালান চানসাউলিনের একটি বাণিজ্যিক এলাকা এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন অনুমোদিত পাসপোর্ট ও ই-পাসপোর্ট সেবা প্রদানকারী আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান এক্সপ্যাট সার্ভিসেস কুয়ালালামপুর সেন্টারের আশপাশে ‘অপস সারকাপ’ পরিচালনা করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে শুরু হওয়া এ অভিযানে একযোগে ১১টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে ২৩ থেকে ৪৮ বছর বয়সি ১১ বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন নারী। প্রাথমিক তদন্তে এসব প্রতিষ্ঠানে জাল নথি তৈরির কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে অভিবাসন বিভাগ।
অভিযানে ১৮টি ল্যাপটপ, ২১টি প্রিন্টার ও স্ক্যানার, তিনটি মোবাইল ফোন এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের ১০টি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি তৈরি জাল ই-পি এল কে এস ও জাল পুলিশ প্রতিবেদন উদ্ধার করা হয়।
অভিবাসন বিভাগের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব জাল নথি বাংলাদেশি নাগরিকদের আন্তর্জাতিক পাসপোর্টের আবেদনে ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। এখন তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ১০টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট কীভাবে ও কার মাধ্যমে চক্রটির হাতে পৌঁছেছে। জাল নথি তৈরির সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
অভিযানের আশপাশ থেকে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আরও ১৯ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৬ জন বাংলাদেশি ১৫ পুরুষ ও একজন নারী। এ ছাড়া মিয়ানমারের একজন এবং ইন্দোনেশিয়ার দুই নারী নাগরিক রয়েছেন। দুই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৯৫৯/৬৩ সালের অভিবাসন আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার আওতায় তদন্ত চলছে।
এদিকে সেপাংয়ে উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার নির্মাণ প্রকল্পে চালানো আরেক অভিযানে উঠে এসেছে ভিন্ন ধরনের অনিয়ম। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত পিএলকেএস ব্যবহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সোমবার সেপাংয়ের একটি আন্তর্জাতিক মানের মোটরস্পোর্টস কেন্দ্রের কাছে উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার নির্মাণস্থল, গুদাম এবং উড়োজাহাজের ইঞ্জিন পরীক্ষার বিভিন্ন স্থাপনায় এ অভিযান চালানো হয়।
জনসাধারণের অভিযোগের ভিত্তিতে এক সপ্তাহ গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর পর পুত্রজায়া অভিবাসন বিভাগের আইন প্রয়োগকারী শাখা অভিযানটি পরিচালনা করে। এতে অভিবাসন বিভাগের ৮৮ কর্মকর্তা অংশ নেন। তারা মোট ২৬১ জনকে তল্লাশি করেন। এর মধ্যে ২১৭ জন বিদেশি এবং ৪৪ জন মালয়েশীয় নাগরিক।
তল্লাশির পর ২৩ থেকে ৪০ বছর বয়সি ১৭৩ বিদেশিকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪৭ জন বাংলাদেশি, ১৭ জন ইন্দোনেশীয় এবং ৯ জন পাকিস্তানি নাগরিক।
অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক জাকারিয়া শাবান বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন উপঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে এমন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের পিএলকেএস অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে বিদেশিদের সামাজিক ভ্রমণ অনুমতিপত্রেরও অপব্যবহার করা হচ্ছিল।
আটকদের পরবর্তী তদন্তের জন্য কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (কেএলআইএ) অভিবাসন আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তদন্তে সহায়তার জন্য পাঁচ মালয়েশীয় নাগরিককে সাক্ষী হিসেবে হাজির হওয়ার নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় একই সময়ে সামনে আসা এ দুটি ঘটনা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও নতুন সতর্কবার্তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে পাসপোর্ট, ভিসা, পিএলকেএস বা বৈধতার সমস্যা সমাধানের নামে দালাল কিংবা অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে মূল পাসপোর্ট তুলে দেওয়া এবং জাল নথি ব্যবহার করার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
একই সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে কাজ করলেও কর্মী যেমন আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন, তেমনি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা ও উপঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইনের আওতায় শাস্তির মুখে পড়তে পারে।
দুটি অভিযানের তথ্য বলছে, বিদেশি কর্মীদের বৈধতা নিয়ে অনিয়ম শুধু কর্মস্থলে নয়; নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট, পাসপোর্ট এবং সরকারি নথিপত্রের পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই নজরদারি জোরদার করছে মালয়েশিয়া।