বিজ্ঞাপন
কাল একনেকে উঠছে গাবতলী-দাশেরকান্দি মেট্রোরেল-৫
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ গড়ে তুলতে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-৫) দক্ষিণ রুটের এই প্রকল্পটি আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উঠছে। ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ। আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার নির্মাণ করা হবে উড়ালপথে। পুরো রুটে থাকবে ১৫টি স্টেশন। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব ও নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে রুটটি।
প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) ঋণ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, পাতাল অংশ নির্মাণে টানেল বোরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশ মাটির নিচ দিয়ে যাওয়ায় রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সড়কের ওপর বড় অবকাঠামো নির্মাণ এবং জমি অধিগ্রহণের চাপ তুলনামূলক কম রাখার সুযোগ তৈরি হবে। পাতাল অংশের টানেল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মেট্রোরেল চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট। শুরুতে ছয় কোচের ১৯ সেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রেন চলাচলের ব্যবধান হবে প্রায় ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। প্রকল্পের হিসাবে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু হতে পারে। শুরুতে একমুখী পথে ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার ১০৭ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মেট্রোরেল চালু হলে যানজট কমার পাশাপাশি নগরবাসীর কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করছে সরকার। প্রকল্পের হিসাবে বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৪১ হাজার ২২০ টন জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানবাহনের চলাচলের দূরত্ব প্রায় ৬ লাখ ৪২ হাজার কিলোমিটার কমতে পারে। এতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা পর্যালোচনার পর কমানো হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনে আগের প্রস্তাবের তুলনায় ব্যয় ২ হাজার ২১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমেছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে ঋণের সুদ ও অঙ্গীকার ফি প্রকল্প ব্যয় থেকে বাদ দেওয়ার কারণে। জমির প্রয়োজন কমানো এবং যানবাহন, পরামর্শক ও প্রশাসনিক খাতের ব্যয় কমানোর কারণেও ব্যয় কমেছে।
প্রকল্পটির প্রস্তুতিমূলক কাজও এরই মধ্যে অনেকটা এগিয়েছে। প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, বিস্তারিত নকশা, দরপত্র সহায়তা, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনার কাজ করা হয়েছে। ২০২২ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়। ফলে একনেকের অনুমোদন পাওয়া গেলে মূল নির্মাণকাজে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব বলেন, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ হয়েছে এবং একনেক সভায় এটি তোলা হচ্ছে। প্রকল্পের বড় অংশ পাতাল পথে নির্মাণ করা হবে।
এদিকে এই মেট্রোরেলকে শুধু একটি আলাদা রুট হিসেবে দেখছে না সরকার। ভবিষ্যতে এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি অন্য মেট্রোরেল রুটের সঙ্গেও সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের যাত্রীরা একাধিক মেট্রোরেল রুট ব্যবহার করে গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে বিপুল ব্যয়ের এই প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে কার্যকর সংযোগ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই হবে না; স্টেশনের সঙ্গে বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহণের সংযোগ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং বিভিন্ন মেট্রোরেল রুটের আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী আকর্ষণ করতে নাও পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে, মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ রুটটি জনবান্ধব প্রকল্প হলেও অন্য মেট্রোরেল রুটের তুলনায় এখানে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই স্টেশনগুলোর সঙ্গে অন্যান্য গণপরিবহণের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।