Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

‘কারাগারেই বাবাকে মেরে ফেলতে চায় তারা’, ইমরান খানের দুই ছেলের গুরুতর অভিযোগ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম

‘কারাগারেই বাবাকে মেরে ফেলতে চায় তারা’, ইমরান খানের দুই ছেলের গুরুতর অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

ইমরান খানকে জেলের ভেতরেই মেরে ফেলার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁর দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান খান। তাঁদের দাবি, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট তারকার শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে বসবাসকারী দুই ভাই সাম্প্রতিক একাধিক সাক্ষাৎকারে বাবার কারাবন্দিত্ব, তাঁর স্বাস্থ্য, পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা এবং যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ইমরান খানকে ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যাতে কারাগারেই তাঁর মৃত্যু ঘটে এবং পরে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়।

কাসিমের ভাষায়, তাঁদের আশঙ্কা হলো, কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘ভেতরেই মেরে ফেলতে’ চাইতে পারে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত আশঙ্কা ও অভিযোগ, যার স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তোশাখানা-২ মামলায় তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ইমরান খান ও তাঁর দল মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগে জমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলাতেও তিনি ১৪ বছরের সাজা পেয়েছেন।

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর আইনজীবী ও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ হারিয়েছেন তিনি। পরে এ নিয়ে চিকিৎসা ও চোখের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু পরে তাঁকে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তাঁর বোন উজমা খান আদালত অবমাননার আবেদন করেন। সেই আবেদনের শুনানি আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর করার কথা রয়েছে।

ইমরানের ছেলেরা বলছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বাবার পর্যাপ্ত চিকিৎসা হচ্ছে কি না, তা নিয়েই তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। তাঁদের দাবি, বাবার স্বাস্থ্যের অবনতির খবর ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে এবং এর পেছনে আরও গুরুতর কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে।

তবে পাকিস্তান সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইমরানকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তাঁর কারাবাসের পর প্রায় ১৯৮টি সাক্ষাৎ-পর্বে ৯০০টির বেশি দর্শনার্থী প্রবেশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর বোন, পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, চিকিৎসক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা। সরকার আরও বলেছে, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ তাঁর এক ছেলের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়েছিল।

সরকারের দাবি, ইমরানকে সাত কক্ষের একটি আলাদা প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে, যেখানে ঘুম, স্যানিটেশন ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁকে বাড়িতে রান্না করা খাবার, টেলিভিশন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেও প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।

এদিকে বাবার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কমে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গভীর হতাশায় আছেন কাসিম ও সুলাইমান। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁরা জানিয়েছিলেন, মার্চের ঈদের সময় সর্বশেষ বাবার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তাঁরা। সেই ফোনালাপও ছিল সীমিত সময়ের। দুই ভাইয়ের দাবি, তাঁরা এখন বাবার দৈনন্দিন অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি জানতে পারছেন না।

ইমরান খান ও ব্রিটিশ চলচ্চিত্র প্রযোজক জেমিমা গোল্ডস্মিথের দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। বাবাকে দেখতে পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ভিসা নিয়ে জটিলতার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মা জেমিমাও ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং ইমরানের পরিস্থিতিকে মানবিক সংকট হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

দুই ভাইয়ের বক্তব্যের পর ইমরান খানের কারাবন্দিত্বের বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে পাকিস্তানের টেস্ট ম্যাচ চলাকালে তাঁদের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারকে ঘিরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে স্কাই স্পোর্টসের বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও আলোচিত করে তোলে।

আগস্টের ওই টেস্টের প্রথম দিনে স্কাই স্পোর্টসে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল আথারটনের নেওয়া কাসিম ও সুলাইমানের প্রায় ১৮ মিনিটের সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের কথা ছিল। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সম্প্রচার ঠেকানোর চেষ্টা করে এবং পাকিস্তান দল মাঠে না ফেরার হুমকি দিয়েছিল বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারিত হয় এবং পাকিস্তান দলও মাঠে ফিরে আসে।

পরে কাসিম ও সুলাইমান পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য, সাক্ষাৎকারে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়নি। তাঁরা কেবল তাঁদের বাবার স্বাস্থ্য ও মানবিক অবস্থার কথা বলেছেন।

ইমরান খানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গন থেকেও সমর্থনের আওয়াজ এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বলেছেন, ইমরানের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত, যাতে যেকোনো মানুষের প্রাপ্য ন্যূনতম মর্যাদা নিশ্চিত হয়। সাবেক ক্রিকেটারদের একটি দলও তাঁর চিকিৎসা ও মানবিক আচরণের দাবি জানিয়েছে।

ইমরানের রাজনৈতিক জীবন নিয়েও দুই ভাইয়ের উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একই বছরের নভেম্বরে রাজনৈতিক সমাবেশের সময় তাঁর ওপর হামলাও হয়, যাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

সুলাইমানের মতে, রাজনীতিতে বাবার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের অবনতিই তাঁদের পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর ভাষায়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর থেকেই তাঁরা বাবার নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে শুরু করেন।

তবে দুই ভাইয়ের লড়াইয়ের পেছনে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তিগত এক গভীর শূন্যতা। তাঁদের সবচেয়ে বড় চাওয়া, বাবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা। নিজেদের জীবন, কাজ, ভবিষ্যৎ কিংবা পড়া বই নিয়ে বাবার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার সেই সুযোগটুকুই তাঁরা ফিরে পেতে চান।

শৈশবের স্মৃতিতে ইমরান খান তাঁদের কাছে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা ক্রিকেট কিংবদন্তি নন, তিনি একজন বাবা। পাকিস্তানের পাহাড়ে বাবার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, টেনিস ও ক্রিকেট খেলা, সন্ধ্যায় একসঙ্গে সিনেমা দেখা কিংবা দাদির বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতি এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।

কাসিম ও সুলাইমানের আশঙ্কা, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার কারণে তাঁরা বাবার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। কাসিমের ভাষায়, বড় হয়ে তাঁরা কেমন মানুষ হয়েছেন, সেটি তাঁদের বাবার জানা খুব প্রয়োজন ছিল।

এই পরিস্থিতিতে বাবাকে দেখতে প্রয়োজনে পাকিস্তানে যাওয়ার কথাও ভাবছেন দুই ভাই। কিন্তু তাঁরা জানেন, সেখানে গেলে তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সুলাইমানের ভয়, তাঁদের কোনো সিদ্ধান্ত যেন কারাগারে থাকা বাবার ওপর আরও মানসিক চাপ তৈরি না করে।

ইমরান খানের পরিবার ও সমর্থকদের অভিযোগের বিপরীতে পাকিস্তান সরকার অবশ্য বলছে, তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা ও কারাবিধি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে তাঁর স্বাস্থ্য, কারাবন্দিত্বের পরিবেশ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এখনো বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

সবকিছুর পরও কাসিম ও সুলাইমানের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক নয়। তাঁরা শুধু তাঁদের বাবাকে একবার সামনে থেকে দেখতে চান। তিন বছর ধরে কারাগারে থাকা ইমরান খানের সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে, সেটিই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টাইমস, আল জাজিরা, এবিসি নিউজ, রয়টার্স

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার