Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

বিমানমন্ত্রীর রেঞ্জ রোভারের বিরুদ্ধে দুই মামলা, কী ঘটেছিল সেখানে

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ পিএম

বিমানমন্ত্রীর রেঞ্জ রোভারের বিরুদ্ধে দুই মামলা, কী ঘটেছিল সেখানে

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে সচিবালয়ে পৌঁছায়। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে একটি গাড়ির নিবন্ধন নম্বর পাঠানো হয় কাকরাইল এলাকায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কাছে। জানানো হয়, গাড়িটি সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। পুলিশ গাড়িটির খোঁজ শুরু করে। তবে তখন আর সেটি কাকরাইল এলাকায় পাওয়া যায়নি। 

পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে গাড়িটির মালিককে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। বিআরটিএর কাগজপত্রে থাকা ফোন নম্বরে কাউকে পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে জানা যায়, সাদা রঙের রেঞ্জ রোভার গাড়িটি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ব্যবহার করেন। পরে সচিবালয়ের ভেতরে গাড়িটি শনাক্ত করা হয়। গাড়িটির পেছনে ‘রেঞ্জ রোভার’ ও ‘স্পোর্ট’ লেখা ছিল। নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-২১২৫।

এরপর গাড়িটির বিরুদ্ধে দুটি মামলা দেওয়া হয়। একটি অনিরাপদভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে, অন্যটি সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরির অভিযোগে। দ্বিতীয় মামলার রসিদে আলাদাভাবে লেন লঙ্ঘনের কথাও লেখা হয়েছে। দুই মামলায় জরিমানা করা হয়েছে তিন হাজার টাকা করে মোট ছয় হাজার টাকা। 

আরও পড়ুন
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের তিনজন কর্মকর্তা, গাড়িটির চালক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তা ছাড়া দুটি মামলার রশিদ থেকেও ঘটনার বিস্তারিত জানা গেছে।  

নম্বর এল কন্ট্রোল রুম থেকে

প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পরিদর্শক আবু মুসা মো. সালেহ আকন্দ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সচিবালয়ে প্রবেশ করার পর কন্ট্রোল রুম থেকে একটি গাড়ির নম্বর জানিয়ে সেটি খুঁজতে বলা হয়। তাদের প্রথমে জানানো হয়েছিল, গাড়িটি সড়কে দাঁড়িয়ে আছে। কাকরাইলের বিভিন্ন জায়গায় গাড়িটি খোঁজা হয়। তবে ততক্ষণে সেটি সেখান থেকে চলে যাওয়ায় পাওয়া যায়নি।

আবু মুসা বলেন, ‘কন্ট্রোল রুম থেকে বলা হয়েছিল একটা গাড়ি রাস্তায় দাঁড়ানো আছে। আমরা খোঁজাখুঁজি করেছি; কিন্তু তখন গাড়িটা পাইনি।’

গাড়িটি না পাওয়ার পর নিবন্ধন নম্বর ধরে বিআরটিএর সার্ভারে খোঁজ করা হয়। আবু মুসা জানান, সেখানে পাওয়া যোগাযোগের নম্বরে ফোন করলে সেটি একটি গাড়ির শোরুমের নম্বর বলে জানা যায়। ফলে ওই পর্যায়েও গাড়িটির ব্যবহারকারী কে, তা জানা যায়নি। 

আরও পড়ুন
এরপর জানা গেল মন্ত্রীর গাড়ি

কিছু সময় পর ট্রাফিক পুলিশ জানতে পারে, গাড়িটি মন্ত্রী পর্যায়ের কারও ব্যবহৃত হতে পারে। তখন ধারণা করা হয়, গাড়িটি সচিবালয়ে থাকতে পারে।

আবু মুসা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের সঙ্গে যুক্ত সদস্যরা পরে সচিবালয়ের ভেতরে খোঁজ করে গাড়িটি শনাক্ত করেন। এরপর গাড়ি ও চালকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে যান।

কাকরাইল এলাকায় গাড়িটি ঠিক কীভাবে চলছিল—সেটি দেখেননি আবু মুসা। গাড়িটি উল্টো পথে গিয়েছিল, নাকি প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরকে ওভারটেক করেছিল—এমন কোনো বিষয় তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে পুলিশের মামলার নথিতে অপরাধের ধরন নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

রশিদে কী লেখা আছে 

ডিএমপির দুটি পিওএস প্রসিকিউশন রসিদে দেখা গেছে, গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-২১২৫। অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে গাড়িটির চালক মো. আরিফ হোসেনের নাম রয়েছে। 

আরও পড়ুন
একটি মামলা হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৮৭ ধারায়। ওই মামলার রশিদে অপরাধ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘অনিরাপদভাবে গাড়ি চালানো’। মন্তব্যের ঘরেও একই কথা লেখা আছে। জরিমানার পরিমাণ তিন হাজার টাকা। রসিদ অনুযায়ী, মামলাটি করা হয়েছে সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে।

দ্বিতীয় মামলাটি হয়েছে ৯২(১) ধারায়। সেখানে অপরাধের বর্ণনায় লেখা হয়েছে ‘সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি’। মন্তব্যের ঘরে লেখা হয়েছে ‘লেন লঙ্ঘন’। এ মামলাতেও তিন হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মামলাটি রেকর্ড করা হয় সকাল ১০টা ৩৩ মিনিটে। দুই মামলার রসিদেই স্থান হিসেবে মৎস্য ভবন ক্রসিং উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ ট্রাফিক কর্মকর্তাদের বর্ণনায় ঘটনার সূত্রপাত কাকরাইল এলাকায় হলেও পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রসিকিউশন রশিদে ঘটনার স্থান মৎস্য ভবন ক্রসিং উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের নথিতে বলা অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্টভাবে রয়েছে অনিরাপদ চালনা, সড়কে প্রতিবন্ধকতা এবং লেন লঙ্ঘনের অভিযোগ।  

আরও পড়ুন
চালক কী বলেছেন

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনার সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত গাড়িতেই ছিলেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রীর গাড়িচালক আরিফ হোসেন বলেন, ঘটনাটি কাকরাইল মোড় এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আসার বিষয়টি তিনি শুরুতে বুঝতে পারেননি এবং পরে গাড়িটি এক পাশে সরিয়ে দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর চলে গেলে তারা সচিবালয়ে যান। সেখানেই মামলা দেওয়া হয়।

আইন কী বলে

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৮৭ ধারা হচ্ছে ৪৪ ধারার বিধান লঙ্ঘনের শাস্তির ধারা। আইনের ৪৪(২) অনুযায়ী, কোনো চালক নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে বা বেপরোয়াভাবে মোটরযান চালাতে পারবেন না। ৪৪(৩) ধারায় বিপজ্জনক বা অননুমোদিতভাবে ওভারটেকিং এবং মোটরযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৪৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে ৮৭ ধারায় সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে একটি দোষসূচক পয়েন্ট কাটার বিধান রয়েছে। 

আরও পড়ুন
অন্যদিকে গাড়িটির দ্বিতীয় মামলা হয়েছে ৯২(১) ধারায়। এই ধারা সড়ক পরিবহন আইনের ৪৯(১)-এর প্রথম অংশে থাকা মোটরযান চলাচলের সাধারণ নির্দেশনা লঙ্ঘনের শাস্তি নির্ধারণ করে।

৪৯(১)-এর প্রথম অংশে, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি, নির্ধারিত অভিমুখের বিপরীত দিকে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে নির্ধারিত স্থান ছাড়া, উল্টো পাশে বা ভুল দিকে গাড়ি থামিয়ে যানজট বা অন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও নিষিদ্ধ।

এসব বিধান লঙ্ঘনের জন্য ৯২(১) ধারায় সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। চালকের ক্ষেত্রে একটি দোষসূচক পয়েন্টও কাটা হবে।

গাড়িটির বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন ট্রাফিক সার্জেন্ট সিফাত মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীর গাড়িতে মামলা দেওয়া যায়, এটা আমিও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা একটা বিরল ঘটনা।’

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার