বিজ্ঞাপন
ফার্মেসি থেকে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
বিজ্ঞাপন
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মেসি থেকে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য থাকায় নাসির উদ্দিন নামে একজন জুনিয়র মেকানিক কর্মচারী দিয়ে ওষুধ বিতরণের কাজ চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত এক মাসে অন্তত অর্ধশতাধিক রোগীকে কয়েক মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পিঠ ও পেটে ব্যথার সমস্যা নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে যান তানজিকা নামের এক নারী। দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে ন্যাপ্রোক্সেন (৫০০ মি.গ্রা.) ও এক্সিয়াম মাপস ২০ ট্যাবলেট লিখে দিলে তিনি হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে তা সংগ্রহ করেন।

পরে লক্ষ করেন, এক্সিয়াম মাপস ২০ ট্যাবলেটের মেয়াদ চলতি বছরের জুন মাসেই শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি ফার্মেসির দায়িত্বরত ব্যক্তিকে জানালে তাকে নতুন মেয়াদের ওষুধ দেওয়া হয়। তানজিকা বলেন, সরকারি হাসপাতালে এভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়া উদ্বেগজনক, ওই দিন তার মতো আরও অন্তত অর্ধশতাধিক রোগীকে একই ধরনের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বাইশগাঁও গ্রামের সাথী আক্তার। কোমরে ব্যথার সমস্যায় নিয়মিত হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে সেবন করতেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি ওষুধ খাওয়ার পর শরীর আরও খারাপ হলে ওষুধের পাতা খতিয়ে দেখেন, তার মেয়াদ এক মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। সাথী আক্তার বলেন, ‘তাদের ভুলের কারণে আমি তো মারাও যেতে পারতাম। এমন ওষুধ তারা আমাকে কেন দিল?’
এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, ওষুধ নেই বলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, অথচ সেই ওষুধই স্টোরে পড়ে থেকে নষ্ট হয়। তিনি বলেন, এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, জনগণের সঙ্গে অবিচার।
বিলকিস আক্তার নামে আরেক রোগী বলেন, বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় সরকারি হাসপাতালে আসেন গরিব মানুষ, কিন্তু ওষুধ না পেয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, পরে জানা যায় সেই ওষুধ হাসপাতালের স্টোরেই পড়ে মেয়াদ হারিয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, চিকিৎসকের লেখা অনেক ওষুধই হাসপাতালের বিতরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায় না, ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়।
ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য থাকায় ফার্মেসিতে কর্মরত জুনিয়র মেকানিক নাসির উদ্দিন বলেন, ২০১০ সালে জুনিয়র মেকানিক পদে তার নিয়োগ হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য থাকায় ২০১৬ সাল থেকে তাকে ফার্মেসিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, স্টোর থেকে যাচাই-বাছাই করেই ওষুধ ফার্মেসিতে রাখা হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ স্টোরে বা ফার্মেসিতে থাকার কথা নয়, তবু ভুলবশত দুই-এক পাতা রোগীদের দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার আবুল বাসার দাবি করেন, স্টোরে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নেই। তবে ভুলবশত এক-দুই পাতা ওষুধ থেকে যেতে পারে বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, মানুষের ভুল হতেই পারে।
উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার মনোহরগঞ্জে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন করে, যেখানে বিনামূল্যে ওষুধসহ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সরকারিভাবে সরবরাহ করা এসব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ক্রয়-বিতরণ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা বাছাই করে তালিকাভুক্ত করার এবং রেজিস্ট্রারে কারণ লিপিবদ্ধ করার কথা।
তবে হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, স্টোর রেজিস্ট্রার ইচ্ছেমতো তৈরি করা হয় — ওষুধ আসার প্রকৃত পরিমাণ ও কাগজে লেখা পরিমাণে গরমিল থাকে, রোগীদের মধ্যে বিতরণেও একই অসংগতি দেখা যায়। ওই সূত্রের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের আগে অতিরিক্ত ওষুধ সরিয়ে রাখা হয় এবং রোগীদের মধ্যে বণ্টনেও অনিয়ম হয়, যার ফলে সময়ে সময়ে সরকারের লাখ লাখ টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হয়।
রোগীদের আরও অভিযোগ, ৫ টাকা দিয়ে বহির্বিভাগের টিকিট কেটেও এনসিডি কর্নার থেকে নিয়মিত ওষুধ মিলছে না। হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যাদের মধ্যে ৪০-৬০ জন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও বার্ধক্যজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগে (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) আক্রান্ত। রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসক পূর্ণ মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দিলেও ওষুধ নিতে গেলে দায়িত্বরত ব্যক্তি মাত্র দুই-তিনটি ওষুধ দিয়ে পাঠিয়ে দেন, আর একাধিক ওষুধ চাইলে রোগীদের অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোর থেকে ওষুধ নামানোর আগে যাচাই করা হয়, তারপরও ভুল হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে ফার্মেসির সঙ্গে আলোচনা করে দায়িত্বরত ব্যক্তির কোনো গাফিলতি আছে কি না তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।