বিজ্ঞাপন
পুলিশ, ময়নাতদন্ত ও স্বজনদের তথ্যে মিলছে না হিসাব
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ এএম
বিজ্ঞাপন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও স্বজনদের দেওয়া তথ্যের কয়েকটি জায়গায় অমিল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হত্যার ধরন, মরদেহের অবস্থা, আসামিদের গতিবিধি, মোবাইল ফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ; এসব বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে গণপতি চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়ার যে দাবি করা হয়েছিল, ময়নাতদন্তে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চোয়াল ভাঙার প্রমাণ মেলেনি
ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, চারজনের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ। মরদেহের মুখের কাছে তরল পদার্থের মতো যে চিহ্ন দেখা গেছে, তা কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিডের কারণে হয়নি। মরদেহ পড়ে থাকার কারণে পচন প্রক্রিয়ায় মুখমণ্ডলে এ ধরনের পরিবর্তন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তে কারও চোয়াল ভেঙে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে।
এর এক দিন আগে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, গণপতি চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে টানার কারণে তার চোখ বেরিয়ে আসে এবং চোয়াল ভেঙে যায়।
দুই বক্তব্যের এই পার্থক্যই এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসামিদের গতিবিধি নিয়েও ভিন্ন তথ্য
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পরে তারা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকার সুযোগে স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবকের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে এই সময়সূচির সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসের দাবি, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে তার ছেলে বাসায় খাবার খেয়ে পাশের বাড়ির সীমান্তের কাছে যায়। শুক্রবার সকালেও সে বাড়িতে এসে নাশতা ও দুপুরের খাবার খায়। পরে শনিবার রাত ৩টার দিকে কাকার বাড়ি থেকে তাকে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়।
তবে সীমান্তের বাবা সুবাস চন্দ্র দাস বলেছেন, সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার রাতে তাদের বাড়িতে থাকেনি। তার ছেলে সীমান্তের সঙ্গে দেখা করে চলে গিয়েছিল।
অন্যদিকে মুগ্ধের মা সোনা রানীর ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার পর মুগ্ধ নিজের ঘরে যায়। পরদিন সকালে তাকে ঘরে পাওয়া যায়নি। দুপুরে ফিরে এসে সে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা বলে।
অর্থাৎ, পুলিশের বর্ণিত সময়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
চারটি ফোন বন্ধ কেন?
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবারের চার সদস্যের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া। পুলিশ বলেছে, আসামিরা আঙুলের ছাপের সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু নিহতদের স্বজন পূজা চক্রবর্তী জানান, শনিবার রাতে তিনি গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের ফোনে একে একে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। চারটি ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়।
রাত পৌনে ৯টার দিকে তিনি বাড়িতে গিয়ে দেখেন, দরজা তালাবদ্ধ এবং পুরো বাড়ি অন্ধকার।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবারের চারটি ফোনের মধ্যে দুটি পুলিশ উদ্ধার করে থাকলে অন্য দুটি ফোন কোথায়? সেগুলো কার কাছে ছিল বা কী অবস্থায় রয়েছে; তদন্তে তার ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কি না
ঘটনার সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল বলেও জানা গেছে। শনিবার রাতে পুলিশ বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ না পেয়ে স্থানীয় এক ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে সংযোগ চালু করে।
ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মনের দাবি, বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে গিয়ে তিনি দেখতে পান, বাড়ির সংযোগ খুলে রাখা হয়েছে। এটি সাধারণভাবে তার ঢিলে হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ছিল না বলেও তিনি জানান।
তবে পুলিশের ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন।
এই দুই বক্তব্যের পার্থক্যও তদন্তে যাচাই করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশের বাড়ির বাসিন্দারাও কিছু শুনতে পাননি
পুলিশ বলছে, নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে আসামিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। অথচ ওই ভবনে থাকা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু কুমার মণ্ডল জানান, তিনি কোনো কিছুই টের পাননি।
তার ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে প্রধান ফটকে তালা দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। গরমের কারণে ফ্যান চলায় বাইরে থেকে কোনো শব্দ বা চিৎকার শোনা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুই যুবকের কাউকেই তিনি চেনেন না। তারা তার ভবনের ছাদ ব্যবহার করে পাশের বাড়িতে গিয়েছিল— এমনটাও তিনি কখনো দেখেননি।
পোশাক নিয়েও প্রশ্ন
সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তারের সময় তার পরনে থাকা শার্টের সঙ্গে ডিবির এক কর্মকর্তার শার্টের মিল নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।
সিদ্ধার্থের বাবা দাবি করেছেন, ছেলেকে পুলিশের হাতে দেওয়ার সময় তার পরনে ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি ছিল।
অন্যদিকে ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তার পরনের শার্টটি আড়ংয়ের। একই নকশা ও রঙের একাধিক শার্ট বাজারে থাকা স্বাভাবিক। তিনি দাবি করেন, সিদ্ধার্থকে যেভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, সেভাবেই তাকে পরে সংবাদ সম্মেলন ও আদালতে হাজির করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি
শনিবার (২৩ আগস্ট) রাতে বাসা থেকে তার পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। নিহতরা হলেন- গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
রোববার বিকেলে চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।