বিজ্ঞাপন
লন্ডন প্রবাসী থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে হুমায়ুন কবির
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
লন্ডনপ্রবাসী বিএনপি নেতা থেকে বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে—হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক উত্থান বেশ ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে বিএনপির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক কর্মকৌশলে ভূমিকা রাখার পর দেশে ফিরে তিনি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হন। এবার সেই উপদেষ্টা পদ থেকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সরাসরি মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলেন তিনি।
হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশই গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ঘিরে। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন এবং দলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিদেশে অবস্থান করেও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তার পেশাগত অভিজ্ঞতাও রাজনীতির বাইরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুক্তরাজ্যে তিনি লন্ডনের মেয়রের দপ্তরে কৌশলগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে লুইশামের নির্বাহী মেয়রের কার্যালয়ে কেবিনেট উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বরিস জনসনের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি টিমে এবং পরবর্তীতে ঋষি সুনাক সরকারের বিচার মন্ত্রণালয়ে একাধিক কেবিনেট মন্ত্রী ও বিশেষ উপদেষ্টার সঙ্গে প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন।
এই অভিজ্ঞতাই তার রাজনৈতিক পরিচয়কে অন্য মাত্রা দিয়েছে। বিএনপির অন্যান্য অনেক নেতার মতো দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতি কিংবা সংসদীয় অভিজ্ঞতার পরিবর্তে তার মূল শক্তির জায়গা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নীতি প্রণয়ন, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে লন্ডনে অবস্থানকালে দলের আন্তর্জাতিক লবিং ও যোগাযোগে সক্রিয়তা তাকে বিএনপির বৈদেশিক নীতিবিষয়ক পরিসরে পরিচিত করে তোলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হুমায়ুন কবির দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান হন। এরপর ২২ অক্টোবর ২০২৫ তাকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) করা হয়। দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ এবং বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান ব্যাখ্যায় তার উপস্থিতি দিন দিন বাড়তে থাকে।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর হুমায়ুন কবিরকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। তার দায়িত্বের আওতায় রাখা হয় পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২৪ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে তার দায়িত্বগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। ছয় মাসের মাথায় সেই উপদেষ্টা পদ থেকে এবার প্রতিমন্ত্রী হলেন হুমায়ুন কবির। ২১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় রদবদলের অংশ হিসেবে তিনি শপথ বাক্য পাঠ করেন।
হুমায়ুন কবিরের নতুন দায়িত্বের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতিতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন রাজনীতিককে মন্ত্রিসভার সরাসরি দায়িত্বে নিয়ে আসা সরকারের বৈদেশিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বিমান ও পর্যটনের মতো দুটি ভিন্নধর্মী খাতের সঙ্গে তার দায়িত্ব যুক্ত থাকায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের পরীক্ষাও দিতে হবে তাকে।
হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তিনি প্রচলিত অর্থে মাঠের রাজনীতি থেকে মন্ত্রিসভায় আসেননি। বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পরিসরে উঠে এসেছেন। এখন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিদেশে অর্জিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করা।
লন্ডনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসর থেকে ঢাকার মন্ত্রিসভা—হুমায়ুন কবিরের এই যাত্রা তাই শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরণের গল্প নয়; বিএনপির আন্তর্জাতিকমুখী রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকের রাষ্ট্র পরিচালনার সরাসরি অংশ হয়ে ওঠার গল্পও।