Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

চট্টগ্রামের ডিসি পদ পেতে ৭০ কোটি টাকার চুক্তি!

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

চট্টগ্রামের ডিসি পদ পেতে ৭০ কোটি টাকার চুক্তি!

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ পেতে তদবিরের উদ্দেশ্যে ৭০ কোটি টাকার লেনদেন ও চুক্তির অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপসচিব ও কন্ট্রোলার অব স্টোর্স মো. সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু চুক্তিপত্র, চেক ও অন্যান্য নথি সামনে এসেছে।

তবে এসব নথি থেকে প্রতিশ্রুত পদগুলো বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথিতে থাকা কিছু দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। এর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, তিনি বিপুল অর্থের বিনিময়ে চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

নথিগুলোতে কোটি কোটি টাকার ঋণ, নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া স্বাক্ষর করা চেক এবং বিভিন্ন পদে নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থার বিবরণ রয়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, ঘটনাপ্রবাহের শুরু গত বছরের ২৪ নভেম্বর। ওই দিন ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সালাহউদ্দিন।

তখন তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চুক্তিতে শাকিল খানের কাছ থেকে সালাহউদ্দিনের ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এই ঋণের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবসার সুযোগ ও কাজের সম্পর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সালাহউদ্দিন তার সিটি ব্যাংকের হিসাব থেকে দুটি চেক দেন। প্রতিটি চেকের মূল্য ছিল ২ কোটি টাকা।

এর প্রায় এক মাস পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক পদে বদলির আদেশ দেয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন।

তবে পরিচালক পদটি তখন শূন্য ছিল না। পরে ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাকে কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে পদায়ন করা হয়।

এরপর সালাহউদ্দিন ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মধ্যে কথিত একটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন সামনে আসে। সেখানে সালাহউদ্দিনকে তার পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

বার্তায় তিনি বলেন, তাকে একটি নির্দিষ্ট পদ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে পদাবনতি দিয়ে অন্য জায়গায় পাঠানো হয়েছে এবং তিনি ‘নিঃস্ব’ হয়ে গেছেন।

ওই কথোপকথনে তিনি তার পদায়নের ব্যবস্থা কে করেছিলেন, তা জানেন বলেও ইঙ্গিত দেন। সেখানে ওই ব্যক্তিকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে নথিতে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

নথিপত্র অনুযায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষে পদায়নের পরও কাঙ্ক্ষিত পদ পাওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। গত ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন একটি লিখিত ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, তাকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে ওই পদে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই।

একই নথির ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালীর বাউফলের মো. হাবিবুর রহমানকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সালাহউদ্দিনের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়।

এরপর আসে সবচেয়ে বড় অঙ্কের চুক্তির কথা। ১৬ জুলাই তারিখের একটি নথিতে সালাহউদ্দিনের কথিত স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগের সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ওই পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে ‘কাজের মাধ্যমে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে আইনগতভাবে এত টাকা উপার্জন করবেন কিংবা অর্থটি শেষ পর্যন্ত কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল—নথিতে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

পর্যালোচনা করা নথিতে সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেক রয়েছে। এসব চেকের মোট মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত পদে নিয়োগের চেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় এসব চেক নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

সোনালী ব্যাংকের বগুড়া করপোরেট শাখার পাঁচটি চেকের মোট মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মূল্য ৫ কোটি টাকা।

নথিতে আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সালাহউদ্দিন তার সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত সার্ভিস প্রোফাইলের কপি দেন। তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও দেওয়া হয়েছিল।

পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, এসব কাগজপত্র দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কথিত লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের আশ্বস্ত করা।

সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার মুঠোফোন হ্যাক করা হয়েছিল, চেক হারিয়ে গিয়েছিল এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি হয়েছিল।

পরে তিনি বলেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়মিত কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব নিয়ে যায়। তবে তিনি কোনো পদ পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি তদন্ত কমিটির সদস্যদের পরিচয় জানাতে রাজি হননি।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার