বিজ্ঞাপন
হাসিনার দেশত্যাগের অজানা অধ্যায়, ২ বছর পর উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
বিজ্ঞাপন
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ছিল নানা গোপনীয়তা ও নাটকীয়তায় ঘেরা। ঘটনার দুই বছর পর সামরিক ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে উঠে এসেছে সেই অভিযানের নতুন কিছু তথ্য। হেলিকপ্টার থেকে সামরিক বিমান, পাইলট-ক্রু, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং ভারত যাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিসহ দেশত্যাগের অজানা অধ্যায়ের নানা দিক তুলে ধরছে যুগান্তরের অনুসন্ধান।
অবশ্য গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পার হলেও এ বিষয়ে সরকারি তরফে অফিশিয়ালি কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। যদিও সূত্র বলছে, গোয়েন্দা সংস্থার বিস্তারিত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারসহ বর্তমান বিএনপি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।
সাবেক ও বর্তমান সামরিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে হাসিনার ভারত যাত্রা সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারোরই আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্পর্শকাতর বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেলেও যুগান্তরের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সেগুলো যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
সূত্র জানায়, গণভবন থেকে হাসিনা ও তার বোনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের পাইলট এবং কো-পাইলট ছিলেন যথাক্রমে এয়ার কমোডর আব্বাস ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বিকাল তিনটা নাগাদ হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণ করে। এ সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে কর্তব্যরত উইং কমান্ডার কানিজ ফাতেমা সংক্ষিপ্ত বেতার বার্তায় রেসকিউ মিশনের অধীনে সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়নের বিষয়টি ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলে জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই এয়ার কমোডর আব্বাসকে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তানে পাঠানো হয়। সেখানে নির্ধারিত সময় শেষ হলে যথারীতি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। পরে তাকে নিয়মিত পোস্টিং দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক হিসাবে কর্মরত। এছাড়া কো-পাইলটের দায়িত্ব পালনকারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির বর্তমানে বাশার এয়ার বেইজের ওসি (অ্যাডমিন) হিসাবে নিযুক্ত।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই ইঞ্জিন চালু অবস্থায় একটি সামরিক পরিবহণ বিমান (সি-১৩০ জুলিয়েট) অপেক্ষমাণ ছিল। এ সময় বিমানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন হাসিনার তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, তার স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকী, তাদের দুকন্যা এবং জামাতা।
অবতরণের পর হেলিকপ্টার থেকে নেমে শেখ হাসিনা উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন। তিনি আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তাকে গণভবনমুখী জনস্রোত এবং অভ্যুত্থান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়। ফলে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি স্বৈরশাসন অবসানের খবর পেয়ে যান।
তবে অন্য একটি সামরিক সূত্র বলছে, হাসিনার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে দিলেও অজ্ঞাত কারণে তারিক সিদ্দিকী নিজে ওই বিমানে ওঠেননি। পরদিন গোপনে তিনি চট্টগ্রাম চলে যান। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নৌপথে দেশত্যাগ করেন। পরে ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে তারিক সিদ্দিকীকে দেশত্যাগে সহায়তার অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েলকে গ্রেফতার করা হয়।
তবে নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসাবে উড্ডয়নের সময় বিমানের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়। প্রচলিত রুট ব্যবহার না করে কিছুটা ঘুরে বিমানটি দিল্লির পথে যাত্রা করে। ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রমের আগ পর্যন্ত বিমানটি রাডারে শনাক্ত হয়নি। ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর পাইলট কলকাতা বিমানবন্দরের এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভারতে অবতরণের পর দেশটির নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পর ক্রু এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে বিমানটি পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসে। পরে পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য ফিলিপাইনে পাঠানো হয়। তবে কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজ বর্তমানে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন।
একটি সামরিক সূত্র জানায়, গণভবন থেকে হাসিনার রেসকিউ মিশন প্রধানত দুটি অংশে পরিচালিত হয়। প্রথম ভাগে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে নিরাপদে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে স্থানান্তর। এরপর সেখান থেকে তাকে সামরিক বিমানে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত রেসকিউ মিশনের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। তিনি ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফির ছেলে।