বিজ্ঞাপন
দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইলো না : তসলিমা নাসরিন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫২ এএম
বিজ্ঞাপন
প্রায় দুই দশক পর আবার কলকাতার মাটিতে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তাসলিমা নাসরিন। কিন্তু এই ফিরে আসা কোনো বিজয়যাত্রার গল্প নয়। বরং দীর্ঘ নির্বাসন, হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা আর ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
শনিবার (১ আগস্ট) কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা গ্রহণ করতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছে ‘ঘর’ শব্দটি। ফিরে এসেছে অপেক্ষা, বিচ্ছেদ আর নির্বাসনের স্মৃতি।
তাসলিমা বলেন, ‘নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতিটি মাস অপেক্ষার। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখের। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি। ফিরে এসেছি একটি অধ্যায়ের কাছে।’
এই প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তে তার সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্য ছিল, ‘ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা এবং নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে চলতে হওয়াটাই আসলে বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন কোনো লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না। ভিন্ন মত পোষণের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।’
তবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যেও নিজের স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তাসলিমা। তার ভাষায়, ‘কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না।’ তিনি বলেন, কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে দলীয় আনুগত্যের প্রয়োজন নেই, আবার দ্বিমত প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের দরকার হয় না।
নিজের জীবনের দীর্ঘ নির্বাসনের ইতিহাসও তুলে ধরেন লেখক। বলেন, ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর একের পর এক সরকার এলেও তার জন্য সেই দরজা আর খোলেনি। পরে কলকাতাও ছাড়তে হয় তাকে।
অগাস্ট মাসের সঙ্গে নিজের জীবনের সম্পর্ক টেনে তিনি বলেন, ‘অগাস্ট আমার জন্মের মাস, অগাস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে অগাস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।’
কলকাতার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও উঠে আসে বক্তৃতায়। ছোটবেলা থেকে সাহিত্য, গান আর ভাষার মধ্য দিয়ে শহরটিকে চিনেছেন তিনি। পরে বাংলাদেশ ছাড়ার পর এই শহরেই আশ্রয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্রয়ও স্থায়ী হয়নি।
সেই অভিজ্ঞতার সারাংশ যেন ধরা পড়ে তার একটি বাক্যে—‘এক বাংলায় আমার জন্ম, আর এক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত একজন বাঙালি লেখকের জন্য দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইলো না।’
তিনি বলেন, ইউরোপ তাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেই আশ্রয় কখনো তার কাছে ‘ঘর’ হয়ে ওঠেনি।
বক্তৃতার শেষ ভাগে তাসলিমা আবারও নিজের দীর্ঘদিনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো ধর্ম বা কোনো মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধী এবং ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই সংবিধান, মানবাধিকার ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে নাগরিক আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে তার বক্তব্যে রাজনীতি যেমন ছিল, তেমনি ছিল ব্যক্তিগত বেদনা। তবে সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল একটি শব্দ—‘ঘর’। যে ঘরের খোঁজে এক বাংলার লেখক আরেক বাংলায় এসেছিলেন, শেষ পর্যন্ত যার জন্য তার আক্ষেপ, ‘দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইলো না।’