Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

টুথপেস্টের পর বাজারে সব সয়াবিন তেলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:০৫ এএম

টুথপেস্টের পর বাজারে সব সয়াবিন তেলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বাজারে খোলা ও বোতলজাত-উভয় ধরনের সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষকের পরীক্ষায় ৬০টি নমুনার সবগুলোতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। ঢাকার কয়েকটি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি নমুনার প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

বিশ্বখ্যাত 'জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন এন্ড অ্যানালাইসিস'-এ গত এপ্রিল মাসে এ গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ হয়। গবেষণায় সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার (Elsevier) এই গবেষণা প্রকাশ করেছে।

গবেষণায় প্রতিটি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে। এতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ছাড়াও এর বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় প্রতিটি নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতির মধ্যে রয়েছে লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটিই), পলিইউরেথেন (পিইউ) ও নাইলন।

গবেষকদের মতে, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার প্রবেশ দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

গবেষণাপত্রটি ২০২৫ সালের আগস্টে জমা দেওয়া হয়। পর্যালোচনা শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গৃহীত হয়। একই মাসে এটি অনলাইনে প্রকাশিত হয়। পরে তা ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় স্থান পায়।

গবেষকরা রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সুপারশপ থেকে তিনটি ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল এবং ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকার খোলা বাজার থেকে তিন ধরনের নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন। মোট ৬০টি নমুনা আধুনিক পরীক্ষাগার প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। ব্র্যান্ডেড তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং নন-ব্র্যান্ডেড তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণার উপস্থিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নন-ব্র্যান্ডেড তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ব্র্যান্ডেড তেলের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেজগাঁও থেকে সংগ্রহ করা নন-ব্র্যান্ডেড তেলের নমুনায় সর্বোচ্চ পরিমাণ দূষণ পাওয়া গেছে। তাদের ধারণা, শিল্পাঞ্চল এলাকার পরিবেশ, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাত্রে তেল সংরক্ষণ, খোলা অবস্থায় বিক্রি এবং অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি এই দূষণের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে ব্র্যান্ডেড তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ায় গবেষকদের ধারণা, উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং কিংবা পরিবহনের বিভিন্ন ধাপেও প্লাস্টিক কণা তেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

কী ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে

গবেষণায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা তন্তুজাতীয় কণা। এ ছাড়া ফ্র্যাগমেন্ট, ফিল্ম, ফোম, পেলেট ও বিডও পাওয়া গেছে। ফাইবারজাতীয় এসব কণা মূলত সিনথেটিক কাপড়, প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ, উৎপাদন পরিবেশ এবং বাতাসে ভাসমান কৃত্রিম তন্তু থেকে আসতে পারে বলে জানান গবেষকরা।

সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আকারে খুব ছোট কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহের কোষ ও টিস্যুতে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে। তবে মানুষের শরীরে এসব কণার প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে প্রথমবারের মতো পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এই দুটি পলিমার উৎপাদন যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, সিলিং উপকরণ বা প্যাকেজিং সামগ্রী থেকে তেলে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।

সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শুধু সয়াবিন তেল থেকেই গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি। একজন শিশু দৈনিক গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা গ্রহণ করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে জমা হলে তা প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এই গবেষণা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ প্রমাণ করেনি। বিষয়টি সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় এবং এ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।

কী বলছেন গবেষকরা

গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন রুনা আক্তার মীম ও সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় সয়াবিন তেলের ব্যাপক ব্যবহার বিবেচনায় এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। যদিও বর্তমান মূল্যায়নে দূষণের মাত্রা ‘মধ্যম’ এবং সামগ্রিক ঝুঁকি ‘নিম্ন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

তারা সুপারিশ করেন, ভোজ্যতেল উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা সম্প্রসারণ এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার