বিজ্ঞাপন
কবিতা পড়তে বাধা, মোহন রায়হানকে অপদস্ত করলেন এনসিপি নেতা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৫ এএম
বিজ্ঞাপন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমিতে স্বরচিত কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কবি মোহন রায়হান। তাকে অপদস্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রম সংগঠন শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক।
এ ঘটনার পর ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে কবি মোহন রায়হানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ওই নেতা।
মোহন রায়হান কবিতাটি পড়ার সময় মঞ্চে আসেন জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেতা আহমেদ ইসহাক। তিনি মোহন রায়হানকে আওয়ামী লীগের দালাল আখ্যা দেন। এরপর স্লোগান দেন। ওই সময় মোহন রায়হান বলেন, “এটি আওয়ামী লীগের কবিতা নয়। কবিতাটি বুঝতে হলে শেষ লাইন শুনতে হবে।”
এই ঘটনার পর ফেসবুক পোস্টে এনসিপি নেতা আহমেদ ইসহাক বলেন, “বাংলা একাডেমির “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক স্বরচিত কবিতা পাঠ” প্রোগ্রামে জুলাই বিরোধী কবিতা পড়ায় আজকে থেকে মোহন রায়হানকে বাংলা একাডেমিতে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হলো।”
এই ঘটনার বিষয়ে কথা iW কবি মোহন রায়হানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমার কবিতার শেষ লাইন ছিল জুলাই কখনও বৃথা যেতে পারে না।”
স্বরচিত কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম, তার ডানে বসা কবি মোহন রায়হান ও কবি হাসান ফকরী। ছবি: বাংলা একাডেমি
মোহন রায়হানের অভিযোগ, “কবিতায় রাজাকার, আলবদরের পুনরুত্থান সম্পর্কে বলেছি। এই কথা শোনার পর ওখানে জামায়াত-শিবিরের লোকজন হট্টগোল শুরু করে। আমি মঞ্চ থেকে নামিনি। কবিতাটি পুরোপুরি পড়েছি, বক্তৃতাও করেছি। তখন যারা ছিল তারা আমাকে হাততালিও দিয়েছে।”
আপনাকে বাংলা একাডেমিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে এই বিষয়ে কিছু বলবেন কি না জানতে চাইলে মোহন রায়হান বলেন, “আমি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য। তারা আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার কে? আমি এ সব ভয় পাই না।”
মোহন রায়হান বলেন, “আমরা এই দেশ জন্ম দিয়েছি। ১৩ বার জেল খেটেছি। জুলাই আন্দোলনে আমরা রাজপথে ছিলাম।”
এই কবি বলেন, “আমি কোনো সরকারের সঙ্গে কখনও আপস করিনি। আমি জাসদ করেছি। এরশাদের সঙ্গে আসায় আ স ম আবদুর রবকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। ইনুকেও তিরস্কার করেছি।”
মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমি আপসহীন উল্লেখ করে মোহন রায়হান বলেন, “আমি ভয় পাই না। জামায়াত শিবির জুলাইকে মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় থাকবে, জুলাই থাকবে জুলাইয়ের জায়গায়।”
কবি মোহন রায়হানকে কবিতা পড়তে বাধা দেওয়ার বিষয়ে এনসিপি নেতা আহমেদ ইসহাকের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বাংলা একাডেমির এই ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা।
মামুন চাকলাদার লিখেছেন, কবি মোহন রায়হানের সম্পূর্ণ কবিতাটি পড়া উচিত। শেষ লাইনে উনি বলেছেন: জুলাই কখনো বৃথা যেতে পারে না।
জুলাইয়ের এখনকার চেহারা নিয়ে যদি কিছু না বলা যায় তাহলে জুলাই ব্যর্থ! জুলাইয়ের উদ্দেশ্য মলিন।
জুবায়ের বিন ইয়াসিন লিখেছেন, “আজ বাংলা একাডেমিতে মোহন রায়হান জুলাই বিরুদ্ধে গিয়ে এ কবিতাটি পাঠ করে। কবি আহমেদ ইসহাক, আবিদ আজমসহ অন্যান্যরা ইনস্ট্যান্ট প্রতিবাদ করে। তখন নামাজ পড়তে যাওয়ায় প্রথম কয়েক মিনিট মিস হলেও পরবর্তীতে আমরাও প্রতিবাদে শামিল হলাম।”
“মোহন রায়হানের দাবি ছিলো, এটি জুলাইয়ের কবিতা— তাকে পুনরায় কবিতাটি পড়ার সুযোগ দেওয়া হোক। সুযোগ পেয়ে তিনি আবারও সে কবিতাটি পড়লেন, এবং তা জুলাইবিরোধী কবিতা ছাড়া ভিন্ন কিছু মনে হয়নি। জাস্ট শেষে নিজের জন্য কিছু সেফটি লাইন রাখা হয়েছে।”
সাংবাদিক আসাদ জামান লিখেছেন, অপমান-গঞ্জনা সব যেন/কবি মোহন রায়হানের জন্য জমা/যতবার তিনি মঞ্চে ওঠেন/সর্পছানা ততবার তোলে ফনা।
কবি কামরুজ্জামান কামু লিখেছেন, মোহন রায়হানের কবিতাটা জুলাই বিরোধী নয়, বরং জুলাইয়ের পক্ষের কবিতা। তাকে কবিতা পড়তে না দেওয়াটাই ফ্যাসিজম।
একাত্তরের রণাঙ্গন থেকে উঠে আসা কবি ও সংগ্রামী মোহন রায়হান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কবিতা আন্দোলনের এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি অগ্নিঝরা একাত্তরের সিরাজগঞ্জের ‘জয় বাংলা’ বেতার কেন্দ্রের কবি। ১৯৬৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি স্বৈরাচার, সামরিক দুঃশাসন, শোষণ, লুণ্ঠন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির এক আপসহীন যোদ্ধা। শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ১৩ বার কারাবরণ করেছেন এবং অসংখ্যবার নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক জান্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করলে, তার পরদিনই প্রথম প্রহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন থেকে সামরিক আইন ভঙ্গ করে প্রথম প্রতিবাদী মিছিল বের করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা মোহন রায়হান। আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের অন্যতম সাহসী সংগঠক হিসেবে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন ১৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা।
১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারির ঐতিহাসিক ছাত্রবিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়ে প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষাভবন ঘেরাওয়ের অভিযোগে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী তাকে অপহরণ করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’-এ গুম করে রাখে। সেখানে টানা ২১ দিন তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন—চোখ ও হাত বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত করা, বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগসহ নানাবিধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে ভারতের চেন্নাইয়ে দীর্ঘ আট ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি পুনরায় চলাচলের সক্ষমতা ফিরে পান।
মোহন রায়হানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তার গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ ও রচনার মধ্যে রয়েছে— জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ, আমাদের ঐক্য আমাদের জয়, সামরিক আদালতে অভিভাষণ, আর হলো না বাড়ি ফেরা, ফিরিয়ে দাও সেই স্টেনগান, শকুন সময়, গোলাপজানের পকেট পঞ্জিকা, মোহন রায়হানের সংগ্রামের কবিতা, মোহন রায়হানের প্রেমের কবিতা, সবুজ চাদরে ঢাকা রক্তাক্ত ছুরি, ঘাতক না প্রেমিক, নিরস্ত্রীকরণ কবিতা, রক্তসিক্ত অশ্রুজবা, কবি কাপুরুষ হলে পৃথিবীতে নামে অন্ধকার।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হন কবি মোহন রায়হান। পরে বিতর্কের মুখে তার পুরস্কার স্থগিত রাখা হয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তার এ পুরস্কার নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মোহন রায়হানকে পুরস্কারের জন্য বাছাই করায় আপত্তি জানিয়েছেন প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী ধারার ২৭ জন কবি ও লেখক।
কবিদের অভিযোগ ছিল- মোহন রায়হান ফ্যাসিবাদের দোসর, কবিতা ব্যবসায়ী এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘কর্নেল তাহেরের খুনি’ আখ্যাদানকারী।
সেই সময় বিবৃতিতে কবিরা উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের পর এই চিহ্নিত আওয়ামী সিন্ডিকেট ফ্যাসিবাদী ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’-এর ব্যানারে নানা সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে পুনরায় মাঠে নেমেছে। মূলত একটি দেশবিরোধী চিহ্নিত সাংস্কৃতিক চক্র রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার অবৈধ চেষ্টায় নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে তাদের এই হীন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
যে কবিতা পড়েছেন মোহন রায়হান
জুলাই এখন
ঝুলে আছে গণি রোডের ঝুলবারান্দায়—
লাল ফিতার ফাঁসিতে শ্বাসরুদ্ধ
শহীদের স্বপ্ন।
জুলাই এখন
হাসপাতালের আইসিইউতে,
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
এক রুগ্ণ শয্যার নিঃশব্দ আর্তনাদ।
জুলাই এখন
নিস্পন্দ মাটির নিচে,
অচেনা গণকবরের অন্ধকারে
নামহীন অগণিত কবরফুল।
জুলাই এখন
গুলিবিদ্ধ পাখির মতো
ডানা ঝাপটায়
অপরাজেয় বাংলা আর রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে।
জুলাই এখন
ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ষক, খুনি আর লুণ্ঠনকারীদের
উল্লাস-উন্মত্ত নৃত্যমঞ্চ।
জুলাই এখন
স্বাধীনতার স্বঘোষিত সোল এজেন্টদের অট্টহাসি,
শিশুর আতঙ্কিত চিৎকার,
মায়ের অশ্রু,
বাবার দীর্ঘ হাহাকার।
জুলাই এখন
মুক্তচিন্তা আর মানবিক হৃদয়বৃত্তির বিরুদ্ধে
জারি হওয়া ফতোয়া;
কবিতা, কথা, সুর আর সংগীতের
গলায় ঝোলানো মৃত্যুঘণ্টা।
জুলাই এখন
অন্ধকারের বর্বরতার
অশনি-সংকেত।
জুলাই এখন
যুদ্ধবাজ হায়নাদের
রক্তাক্ত চারণভূমি।
জুলাই এখন
একাত্তরের পরাজিত শক্তির
নতুন মুখোশে ফিরে আসা
ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র।
জুলাই এখন
রাজাকার, আলবদর আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির
নির্লজ্জ পুনরুত্থানের প্রতিধ্বনি।
ভেবেছিলাম—
জুলাইয়ের যুদ্ধে বিজয়ী হলে
শৃঙ্খলমুক্ত স্বদেশে
মুক্ত আলো, মুক্ত বাতাসে
বুকভরে নেব নিঃশ্বাস।
কেউ আর চোখ রাঙাবে না,
কেউ আর ভয় দেখাবে না,
কেউ দাদাগিরির বিষদাঁত উঁচিয়ে
মানুষের স্বপ্ন গ্রাস করবে না।
আমিই হবো আমার নিজের রাজা,
তুমি থাকবে আমার হাত ধরে—
আমরা হাঁটব
স্বাধীন পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে,
মুক্ত মানুষের মতো।
কিন্তু আজ
স্বপ্নগুলো কেন এত দূরের নক্ষত্র?
কেন শহীদের রক্তের ওপর
আবারও অন্ধকারের ছায়া?
কেন স্বাধীনতার নামে
স্বাধীনতাই বন্দি?
তবে কি
জুলাইয়ের রক্তঋণ
এখনও শোধ হয়নি?
তবে কি
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ
অপূর্ণই থেকে যাবে?
না—
ইতিহাসের শেষ বাক্য
এখনও লেখা হয়নি।
যতদিন মানুষের হৃদয়ে
স্বাধীনতার আগুন জ্বলবে
ভালবাসার ফুল ফুটবে
ততদিন জুলাই বেঁচে থাকবে—
প্রতিবাদে, প্রতিরোধে,
ন্যায়ের পতাকায়,
মুক্ত মানুষের অদম্য উচ্চারণে।
জুলাই কখনো বৃথা যেতে পারে না।