Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসছে : আলোচনায় আছেন যারা?

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৯ এএম

রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসছে : আলোচনায় আছেন যারা?

বিজ্ঞাপন

ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আগামী সপ্তাহে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। 

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। কিন্তু ইতোমধ্য সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে বার্তা পাঠানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির দপ্তরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে।

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ক্ষেত্রে তাঁকে স্পিকারের উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তাঁর সফর বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান গতকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন– এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। 

যদিও বুধবার বিএনপি সরকারের একাধিক মন্ত্রী এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা তাদের জানা নেই বলে এড়িয়ে গেছেন। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নানা পর্যায়ে জ্যেষ্ঠ দুই থেকে তিন নেতার নাম নিয়ে আলোচনা আছে। 

বঙ্গভবন সূত্রের দাবি, স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতির পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। এ কারণ দেখিয়ে মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তিনি দুই দফায় সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) গেছেন। সেখান থেকে তাঁকে পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

এর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত সাহাবুদ্দিনের এই মেয়াদ ২০২৮ সালের ২৪ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা।

আইন অনুযায়ী, সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্যরাই গোপন ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধান বিচারপতির কাছে শপথবাক্য পাঠ করেন। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি ওঠে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে। তবে এ নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বিএনপি। শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। 

তবে গত ডিসেম্বর মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ‘অপমানিত বোধ করছেন’। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সরে যেতে চাই; আমি সরে যেতে আগ্রহী। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দুপুরে বঙ্গভবনে নৌবাহিনীর বিদায়ী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানকে সাক্ষাৎ দেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। গত ১৫ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে বাণী দেন তিনি। 

এর আগে ২৫ জুন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ৯ জুন মরক্কোর নতুন রাষ্ট্রদূত লালা বুতাইনা এল কেরদুদি এল কুলালির পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি।

সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ৩৫ বছর। তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করেন। তিনি স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেন।

সংবিধানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষের আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। আর পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। 

রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী হলে বিধান অনুযায়ী ভোট গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালে এই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ সময় অধিবেশন না থাকলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোট গ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ‘সম্ভাব্য পদত্যাগ’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে কিছুটা গুঞ্জন। ফলে জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, আসলেই কি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন? আর তিনি পদত্যাগ করলে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতিই বা কে হচ্ছেন? তবে মহলবিশেষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন গুঞ্জন ছড়াতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। তাদের মতে, সংসদ অধিবেশন শেষ হলো মাত্র এক সপ্তাহ আগে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ-সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাছাড়া ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা নেই।

এদিকে দলটির নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বিএনপির মধ্যেই বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা রয়েছেন, যারা এই পদের জন্য যোগ্য। দলের বাইরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এলে বিএনপি নেতাকর্মীরা হতাশ হবেন বলেও মনে করেন তারা।

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে কেন্দ্র করে আলজাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করেই মূলত রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে।

বুধবার দেওয়া পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের দাবি করেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো, নতুন রাষ্ট্রপতি হিসাবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।’ এই পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর বুধবার বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতা যুগান্তর অফিসে ফোন করে ‘আদৌ এ ধরনের সম্ভাবনা আছে কি না’ জানতে চান। সঙ্গে নেতারা এও বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে কাউকে নির্বাচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি বিএনপি থেকেই হবে। এ প্রসঙ্গে তারা প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও ড. ওসমান ফারুকসহ অনেকের নাম উল্লেখ করেন। তারা বলেন, শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ থাকলে খন্দকার মোশাররফ হোসেনেরই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ছিল। তাকে না করা হলে অন্য যে কোনো প্রবীণ নেতাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হতে পারে। তবে অতীতে দলের বাইরেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার একাধিক নজির রয়েছে। আওয়ামী লীগের পছন্দে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। অন্যদিকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি করেছিল অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। সে হিসাবে বিএনপির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নাসিমুল গনির নাম আলোচনায় আসা স্বাভাবিক বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

বিএনপির অন্তত ৪ জন মন্ত্রী প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, সরকারের ভেতরে আপতত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সংক্রান্ত কোনো আলোচনা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই পোস্ট নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি তারা। তবে কেউ কেউ এই পোস্টে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন সময় আন্দোলন চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। তবে রাজনৈতিক কৌশল ছাড়াও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিএনপি এই পদে পরিবর্তন চায়নি। দলটির নেতারা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ থাকলে বিগত বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। কিন্তু এখন হঠাৎ করে তিনি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে কেউ মনে করেন না। তবে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে রাষ্ট্রপতির প্রতি বর্তমান সরকারের পুরোপুরি আস্থা রয়েছে, সেটিও আবার সবাই মনে করেন না।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার