বিজ্ঞাপন
সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার নেপথ্যে যারা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম
বিজ্ঞাপন
৪৫ বছর আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে গুলিতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য আজও উন্মোচিত হয়নি। প্রশ্ন থেকেই গেছে—কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল? কেন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করার আগেই হত্যা করা হয়েছিল?
হত্যাকাণ্ডের ভয়াল রাত
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অতর্কিত হামলা চালায় সেনাবাহিনীর একদল সদস্য। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, হামলায় ব্যবহৃত হয় ১১টি সাবমেশিনগান, ৩টি রকেট লঞ্চার ও ৩টি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল। হামলায় জিয়াউর রহমান ছাড়াও লে. কর্নেল আ.ক.ম. মঈনুল আহসান, ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানসহ মোট ৮ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম. চৌধুরী তার ‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড’ বইতে লিখেছেন, ভোররাতে গোলাগুলির আওয়াজে তার ঘুম ভাঙে। সার্কিট হাউজের এক সহকারী প্রটোকল অফিসার তাকে জানান, ভোর চারটার দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি গুলি করতে করতে সার্কিট হাউজে প্রবেশ করে এবং সিঁড়ি বেয়ে ওপরে রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার গুলির শব্দ শোনা যায়।
কারা অংশ নিয়েছিল?
প্রত্যক্ষ হামলাকারী দলে ছিল ১৬ জন সামরিক কর্মকর্তা ও কিছু সংখ্যক সাধারণ সৈনিক। উইকিপিডিয়ায় তালিকাভুক্ত হামলাকারীদের মধ্যে রয়েছেন—লে. কর্নেল মতিউর রহমান, মেজর স.ম. খালেদ, লে. কর্নেল শাহ মো. ফজলে হোসেন, মেজর মোজাফফর হোসেন, ক্যাপ্টেন জামিল হক, ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, মেজর আ.জ. গিয়াসউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন সৈয়দ মোহাম্মদ মুনীর, লে. রফিকুল হাসান খান প্রমুখ।
হত্যাকাণ্ডের দুই দিনের মধ্যে বিদ্রোহ দমন করা হয়। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে ১২ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়, প্রশ্ন হলো—এই সেনা কর্মকর্তারা কি সত্যিই নিজেরাই হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন, নাকি তাদের পেছনে আরও বড় কেউ ছিল?
হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী: মঞ্জুর নাকি আরও কেউ?
জিয়া হত্যার পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুরকে প্রধান আসামি করে তৎকালীন সরকার প্রচারণা চালায়। মঞ্জুর ওপর অন্যায়ের অভিযোগ এনে তাকে হত্যা করে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, অভিযোগ রয়েছে যে— জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এরশাদের সরাসরি নির্দেশেই মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রভাবশালী একটি সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো। তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাটহাজারী থানায় আটক থাকাকালে মঞ্জুর বারবার বলেছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের সামনে কথা বলতে চান। তিনি চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলে নিরাপদ হেফাজতে যেতে, যাতে তিনি ট্রায়াল ফেস করতে পারেন। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মঞ্জুরের আত্মগোপন ও গ্রেপ্তার
জিয়া হত্যার পর আত্মগোপনে যাওয়ার পথে মঞ্জুরকে আটক করে পুলিশ। ১৯৮১ সালের ১ জুন তাকে হাটহাজারী থানায় নিয়ে আসা হয়।
থানায় রাখা অবস্থায় মঞ্জুর ডিআইজি সাজাহানের কাছে অনুরোধ জানান, ‘আমাকে কিছু সাংবাদিক ডেকে দেন। আমি সাংবাদিকদের সামনে কথা বলতে চাই।’ এবং জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি যার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলাম, তাকে একটু ডাকেন।’
সেনা হেফাজতে নেওয়া ও পরিকল্পিত হত্যা
তথ্য অনুযায়ী, ওপর মহলের নির্দেশে মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়। ঢাকাভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকাটাইমসের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৮১ সালের ১ জুন মধ্যরাতে ওপর মহলের নির্দেশে ঠান্ডা মাথায় মাত্র একটিমাত্র বুলেটে মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়।
প্রথম আলোর ‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যার কিছু সময় আগেই মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে সেনা হেফাজতে নিয়ে নেওয়া হয়। গোপন এক সূত্রের বরাতে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ঢাকা থেকে আসা এক ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা বন্দি মঞ্জুরের কক্ষে ঢুকে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করেন।
সুরতহাল রিপোর্টের ফারাক
এই হত্যাকাণ্ডের সরকারি ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার মধ্যে সুস্পষ্ট অসংগতি রয়েছে। সেনা সদর দপ্তর দাবি করেছিল যে— মঞ্জুর জনতার হাতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের বর্ণনায় প্রমাণিত হয়, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা।
অপর একটি অনলাইন প্রোটাল প্রিয় ডটকমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলায় ২৮ জন কর্মকর্তা ও সদস্যকে সাক্ষী করা হয়। তাদের জবানবন্দিতে স্পষ্ট হয়েছে, এরশাদের নির্দেশেই মঞ্জুরকে হাটহাজারী থানার পুলিশ হেফাজত থেকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা কারী: ওপর মহলের নির্দেশ
বিমানবাহিনীর তৎকালীন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দিন মামলায় দেওয়া এক জবানবন্দিতে বলেছেন, এরশাদের নির্দেশেই মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিয়া হত্যার আগেই উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা হুমকি দিয়েছিলেন। বাংলাভাষী ব্লগ প্রোটাল আলাপনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্নেল শওকত আগেই বলেছিলেন, ‘যখনই জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যাবেন, তখনই তাকে হত্যা করা হবে।’। এটি ইঙ্গিত দেয় যে এই হত্যাকাণ্ড ছিল সুপরিকল্পিত, কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ ছিল না।
৪৫ বছরেও বিচার হয়নি কেন?
জিয়া হত্যার বিচারের নামে যা হয়েছে, তা ছিল সামরিক আদালতের সংক্ষিপ্ত বিচার (কোর্ট মার্শাল)। পুলিশ বাদী হয়ে চট্টগ্রামের আদালতে মামলা দায়ের করলেও সিভিল ট্রায়াল কখনোই সম্পন্ন হয়নি। মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার বিচারও দীর্ঘ ২৭ বছরেও শেষ হয়নি।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার অভিযোগ পেয়েও ‘ওপরের নির্দেশে’ নীরব থাকেন। আর সেনাপ্রধান এরশাদ নিজেও এই মামলায় আসামি থাকলেও পরবর্তীতে অব্যাহতি পান। মঞ্জুরের ভাই ১৯৯৫ সালে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু সেই মামলা আজ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
তাহলে জিয়া হত্যার পেছনে কারা ছিল?
উপলব্ধ তথ্য ও তদন্ত বলছে, জিয়া হত্যাকাণ্ড একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। প্রত্যক্ষ হামলা চালিয়েছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশ, কিন্তু সেই হামলার পেছনে ছিল ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতা। এই হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে যিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছান, তিনিই মূল সুবিধাভোগী—তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিয়া হত্যার পেছনের হোতা ও মঞ্জুরের মুখ বন্ধের নির্দেশদাতা হিসেবে বারবার তার নাম উঠে এসেছে।
৪৫ বছর পেরিয়েও জিয়া হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন ও সঠিক বিচার হয়নি বলে আক্ষেপ করছে একটি বড় অংশ। প্রশ্ন থেকেই যায়—জিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল চক্রীরা কারা? কেন ১৯৮১ সালে মঞ্জুরকে বিচারের মুখোমুখি করে সব সত্য উদঘাটনের সুযোগ দেওয়া হয়নি? আর কেন ৪৫ বছর পরেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কখনো জানা যাবে না। কিন্তু যত দিন না এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তত দিন জিয়া হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে থাকবে।