বিজ্ঞাপন
টেকনাফ সীমান্তে রাখাইন রাজ্যে বোমা হামলা: প্রকম্পিত সীমান্ত এলাকা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও দফায় দফায় বোমা বিস্ফোরণ ও ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়েছে সীমান্ত এলাকা।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুর থেকে এসব বিকট শব্দ ভেসে আসায় সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং ও হ্নীলা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার শঙ্কায় অনেক জেলে নাফ নদী থেকে তীরে ফিরে আসেন।পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
স্থানীয় সূত্র জানায়, টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি এলাকার বাড়িঘর কেঁপে ওঠে বলে দাবি স্থানীয়দের। এর আগে বুধবার দিন ও রাতেও মংডু এলাকায় বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়।
শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা ফয়েজ আহমেদ বলেন, দুপুরের দিকে বলিবাজার ও কুমিরখালী এলাকা থেকে পরপর কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। শব্দের তীব্রতায় বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। এখন পর্যন্ত অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, প্রায় এক বছর আগে একই সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছিল। সে সময় দীর্ঘদিন সীমান্তবাসী আতঙ্কে ছিলেন। নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় জেলে মুজিবুর রহমান বলেন, সকালে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুপুরের দিকে সীমান্তের ওপার থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত তীরে ফিরে আসি।
উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। পরিস্থিতির ওপর বিজিবির কড়া নজরদারি রয়েছে এবং সীমান্তে সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
এদিকে সীমান্তজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাখাইনে বিমান হামলা, সাগাইংয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ :
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে জান্তা বাহিনী। এতে বহু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে সাগাইং অঞ্চলে জান্তাবিরোধী দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাখাইনের বুথিডং উপজেলায় যুদ্ধবিমান থেকে শহরের আশপাশের গ্রামগুলোতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১০টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে সাগাইং অঞ্চলের মোনিওয়া শহরে সমান্তরাল জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) অনুগত পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) এবং পিপলস সিকিউরিটি ফোর্সের (পিএসএফ) মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পিএসএফের কয়েকটি ক্যাম্পে পিডিএফের আকস্মিক অভিযানের পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন।
দেশ ছাড়ছেন লাখো মানুষ :
চলমান সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এড়াতে দেশ ছাড়ছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে প্রায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন। নিরাপত্তা সংকট, জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির আশঙ্কা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থাই এই দেশত্যাগের প্রধান কারণ।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি এবং প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে দেশটিতে ৩৭ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া প্রতি পাঁচজনের একজন তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছেন। এই মানবিক সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও পড়ছে।