বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ১৭ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুদেশের মধ্যে ১৭ টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুক্রবার দুদেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়।
শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টায়) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীনের বেইজিং সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন জানান, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের নেতৃত্বের সম্মতির উপর ভিত্তি করে মোট ১৭ টি মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। তার মধ্যে ১৩ টি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুদেশের বিভিন্ন গভর্নমেন্টের মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি স্বাক্ষর হয়েছে। ৩ টি হয়েছে বাংলাদেশের বিডার সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের এবং একটা হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি অর্থাৎ দুটি দেশের বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের ভেতরে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, চীনের প্রত্যেকে বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্কের দিক থেকে আজকে যে অবস্থানে রয়েছে তার পেছনে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিভিন্ন সময় ফ্যাসিলিটেট করেছেন, পলিসি দিয়েছেন, বারবার এখানে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন সেগুলোকে উনারা এপ্রিশিয়েট করেছেন। বাংলাদেশের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী আবারও নিশ্চিত করেছেন আমাদের ‘ওয়ান পলিসি, ওয়ান চায়না’ পলিসি অর্থাৎ চায়নাকে আমরা একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখি, যার ভেতর তাইওয়ান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেটি সুসংহতভাবে সুনিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায় অংশীদার চীন উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, এখানে আমাদের এক্সপোর্টের পরিমাণ খুব সীমিত, কিন্তু চীন থেকে বাংলাদেশে ইম্পোর্টের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। কিন্তু এটাকে নিয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ভিতরে, সরকার প্রধানের ভিতরে আলাপ আলোচনার জন্য ডিটেইল প্লাটফর্মে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে কিভাবে বাংলাদেশ থেকে আমরা ট্রেড গ্যাপটা কমাতে পারি। যেমন যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি রয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপাসিটি রয়েছে, সেই সেক্টরগুলোকে আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারি কিনা এবং তার থেকে এক্সপোর্ট করে বাংলাদেশে আমরা বাড়াতে পারি কিনা। আমাদের এগ্রিকালচার প্রোডাকশন কিভাবে বাড়াবো যে গার্মেন্টস রপ্তানি হয়, বাংলাদেশ থেকে তার একটা বড় অংশ ‘র’ মেটেরিয়ালস কিন্তু আমরা চীন থেকে বাংলাদেশে প্রথমে আমদানি করি, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করি। সেই প্রোডাক্টগুলো কি আমরা ‘র’ মেটেরিয়ালস হিসেবে বাংলাদেশে প্রডিউস করতে পারি কিনা এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের বর্তমানে যে সাপ্লাই চেইন রয়েছে তা কিন্তু চীনে অনেকটা এগিয়ে। দেখা যাচ্ছে তাদের অনেক ফ্যাক্টরি রিলোকেট হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। চীনের নেতৃত্ব বলেছে রিলোকেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিভাবে প্রাধান্য দেওয়া যায়। যেসব জায়গায় বাংলাদেশের হিউম্যান রিসোর্স রয়েছে, টেকনিক্যাল ক্যাপাসিটি রয়েছে, সেই ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আমরা কিভাবে জব ক্রিয়েট করতে পারি এগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে চীনের দিক থেকে বাংলাদেশের ট্রেড কিভাবে বাড়ানো যায়, বাংলাদেশে কিভাবে ফ্যাক্টরি প্রেজেন্স বাড়ানো যায় এগুলো নিয়ে উনারা কাজ করবেন। যে ইনভেস্টমেন্টগুলো হবে চীন থেকে, সেখানে অবশ্যই কর্মসংস্থানকে একটি অন্যতম প্রাধান্যের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অনেক ধরনের উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট চলমান রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, সামনে এই প্রজেক্টগুলোর ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে চায়। সড়ক, ব্রিজ, রেলওয়ে চীন আমাদেরকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশন মেকানিজমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চায়। গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ভিতর রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে একটা ইকোনমিক এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করার জন্য। একই সঙ্গে মংলা ইকোনমিক জোন, গ্রীন ডেভেলপমেন্ট অর্থাৎ গ্রীন এনার্জি এবং এর পাশাপাশি যেখানে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্টের জায়গা রয়েছে ইকোলজিক্যাল এবং এনভারনমেন্ট ফ্রেন্ডলি বিভিন্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট রয়েছে, সেগুলোকে চীন প্রায়রিটাইজ করতে চাচ্ছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যা বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে চীন পাশে থাকতে চায় বলেও জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, তিস্তা প্রজেক্টের বিষয়ে আমাদের মহাপরিকল্পনা রয়েছে, যা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমরা যাচ্ছি। এখানকার প্ল্যানিং, ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং টেকনিক্যাল যেকোনো সাপোর্টে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ পানি ব্যবস্থাপনায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। এই মহাপরিকল্পনার প্ল্যানিং স্টেজ থেকে শুরু করে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রোভাইড করা, তার উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রজেক্ট ডিজাইন করা, প্ল্যানিং, এক্সিকিউশন সব জায়গাতে ধারাবাহিকভাবে চীন সরকার যুক্ত হবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রস্তাবনা এসেছে কিভাবে বাংলাদেশ এবং চীন হয়ে একটি ইকোনমিক করিডর তৈরি করা যায়। যে ইকোনমিক করিডরের মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও ব্যাপ্তি বাড়ানো।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম পোর্টকে আরও কিভাবে আধুনিকরণ করা যায় এবং আমরা একটা রিজিনাল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। যেখানে শুধু বাংলাদেশের জন্য না চিটাগাং পোর্ট অন্যান্য দেশের জন্য সার্ভ করবে সেটা নিয়ে যেমন আমরা কাজ করতে চাই, একই সঙ্গে মংলা পোর্টকে আরও বেশি প্রগ্রেসিভ করার জন্য সার্ভিস অরিয়েন্টেড করার জন্য চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকেও আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ এবং চীনের মাঝে বহুপাক্ষিক যে সম্পর্ক তার অংশ হিসেবে আমরা পিপল টু পিপল টাইস বাড়াতে চাই। আমাদের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা ব্যবস্থা, যেমন ইতোমধ্যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিং কে প্রাইরিটাইজ করা হচ্ছে, টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনকে প্রায়রিটাইজ করা হচ্ছে এবং এই দুই ক্ষেত্রেই চীন তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, চীনা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদেরকে শিক্ষক এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল সাপোর্ট উনারা প্রোভাইড করবেন, হেলথকেয়ারের ক্ষেত্রে কিভাবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বাংলাদেশে আমরা প্রয়োগ করতে পারি বিভিন্ন ধরনের রোবটিক সার্জারি এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা থেকে অন্যান্য বিষয়ে চিন্তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা করতে চান চীন, সেখানে ভিসা প্রসেসিং ইজি করার মাধ্যমে এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশি যারা বিদেশে চিকিৎসা করতে চান তাদের জন্য দ্বার উন্মোচন করতে ইচ্ছুক।
মাহদী আমিন জানান, পাশাপাশি সংস্কৃতি, মিডিয়া, টেকনোলজি, সামগ্রিকভাবে নলেজ ট্রান্সফার এবং এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন নিয়ে আমরা পিপল টু পিপল অর্থাৎ দুই দেশের ভিতরে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চাই।
এই উপদেষ্টা বলেন, ফরেন এবং ডিফেন্স এই দুইটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে চায়নার ‘টু প্লাস টু’ একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। যেখানে দুই দেশের ফরেন মিনিস্ট্রি এবং ডিফেন্স মিনিস্ট্রি থেকে রিপ্রেজেন্টেটিভ যারা রয়েছেন উনাদের নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে ডায়লগ শুরু হবে। এই ইন্স্ট্রুমেন্টের ডিটেইলসটা ওয়ার্কআউট করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতা এবং টেরিটরি ইন্টিগ্রিটিকে সম্মান জানিয়ে চীন বলেছে, গণতন্ত্র ব্যবস্থায় বাংলাদেশে যেভাবে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে একটি সরকারের, যেটির পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বহিঃপ্রকাশ, সেটি নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশও চায় যেমন স্বাধীন সার্বভৌম থাকতে, চীনও চায় তার মতো করে স্বাধীন সার্বভৌমভাবে দেশ পরিচালনা করতে। এটা একটা গ্লোবাল ভ্যালু যেটা আমরা হোল্ড করতে চাচ্ছি।
ব্রিকসে মেম্বারশিপের জন্য বাংলাদেশ যখন আবেদন করবে চীন সেটাকে স্বাগত জানাবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
মাহদী আমিন আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের যে আলোচনা হয়েছে এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, আমাদের একটা নতুন রূপরেখা হয়েছে ফর লং টার্ম সাস্টেইনড এবং ট্রাস্টেড রিলেশন। এই নিউ ব্লুপ্রিন্টের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছি এবং তার উপর ভিত্তি করে আগামী বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। যেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা উন্নয়ন এ ধরনের বহুপাক্ষিক বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে ধারাতে আমরা এসে পৌঁছেছি, সেটাকে ধারণ করে কিন্তু একটা দীর্ঘমেয়াদী, কৌশলগত, অংশীদারিত্বের সুসম্পর্ক ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত করব।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হকসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।