বিজ্ঞাপন
যে কারণে দিল্লিতে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন ডা. জাহেদ
অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:৩৮ এএম
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাঢ়েকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তলব করে আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ জানিয়েছে এবং ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
গতকাল থেকে দুই দিনব্যাপী দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) বৈঠকে অংশ নিতে রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি; তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তবে বিমানবন্দরে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের সময় একটি নজরদারি তালিকায় উপদেষ্টা জাহেদের নাম উঠে আসার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখা হয়। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দিলেও দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার প্রতিবাদে তিনি সরকারি সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
যা হয়েছিল জাহেদের সঙ্গে: নয়াদিল্লিতে ১৫-১৬ জুন আইওআরএ সিনিয়র অফিসিয়ালস কমিটির (সিএসও) ২৮তম সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘ইনোভেশন, ওপেননেস, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড অ্যাডাপ্টেবিলিটি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অগ্রগতি পর্যালোচনা, আঞ্চলিক অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইওআরএ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বৈঠকে আমন্ত্রিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বৈঠকে যোগ দিতে রোববার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাধারণ পাসপোর্টে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে দিল্লি যান। তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্টে ভ্রমণ করেননি। বিমানবন্দরে নামার পর তাকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ অভ্যর্থনা জানান এবং ইমিগ্রেশন ডেস্কে নিয়ে যান। একপর্যায়ে হাইকমিশনার লক্ষ করেন, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত কম্পিউটার স্ক্রিনে খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না। প্রায় ১৫ মিনিট কেটে যাওয়ার পর বাংলাদেশের হাইকমিশনার তার কাছে জানতে চান, ‘কোনো সমস্যা আছে কি?’ কিন্তু ওই কর্মকর্তা নীরব থাকেন। এর কিছুক্ষণ পর ওই কর্মকর্তা জাহেদ উর রহমানের জন্মস্থান কোথায়, এর আগে ভারত সফর করেছিলেন কি না জানতে চান। এর পর ডেস্ক থেকে উঠে ওই কর্মকর্তা ভেতরে যান। ফিরে এসে তিনি জাহেদ উর রহমানের আঙুলের ছাপ এবং আইরিশ স্ক্যান নেন। কিছুক্ষণ পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বলেন, ‘আপনি সোফায় গিয়ে বসুন। কিছুটা সময় লাগবে।’ একপর্যায়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে জানানো হয়, ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগের নথিতে জাহেদ উর রহমানকে বারড বা ওয়াচলিস্টে দেখানো হচ্ছে। এ সময় তৎক্ষণাৎ দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে ভারতের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ভারতে প্রবেশ না করে ঢাকায় ফেরত আসেন। জানা যায়, তিনি নিজেই পাসপোর্ট ফেরত চান এবং সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। তবে তার সঙ্গে থাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকায় তাদের দিল্লিতে প্রবেশে অসুবিধা হয়নি।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কূটনৈতিক জানান, এ ধরনের ঘটনায় ঢাকা গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে সরাসরি এ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
ঢাকায় যেভাবে ফেরত এলেন জাহেদ: দিল্লিতে জিজ্ঞাসাবাদের পর ইমিগ্রেশন তাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেও দেশটিতে না গিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসেন উপদেষ্টা। বিমানবন্দর থেকে রোববার রাতেই তিনি কলম্বোর উদ্দেশে রওনা দেন। পরে গতকাল সকালে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কলম্বো থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর বিমানবন্দর থেকে বের হন তিনি।
সূত্র জানায়, দিল্লির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের প্রতিবাদে জাহেদ উর রহমান দেশটিতে প্রবেশ না করেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্টে ভ্রমণ করেননি এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ভারতে প্রবেশের জন্য কোনো ভিসাও নেননি। তিনি বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত সার্ক ভিসায় ভ্রমণ করেছিলেন। এ ছাড়া নানা সময়ে জাহেদ উর রহমান বিভিন্ন টকশোতে ভারতবিরোধী মন্তব্য করতেন। ফলে তার নামটি কালো তালিকাভুক্ত থাকতে পারে। তবে সূত্র বলছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার সার্ক ভিসার তথ্যাদি যাচাইয়ের পর তাকে ছাড়পত্র দিলেও তিনি দিল্লি না গিয়ে ঢাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ: এ ঘটনায় বাংলাদেশ অসন্তোষ জানিয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার ঘটনা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক’। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে।
এদিকে দিল্লি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে আটকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঢাকার কাছে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এটা শুনেছি গণমাধ্যমের মারফতে, যা ঘটেছে তা সুখকর নয়। এ ধরনের ঘটনা আমরা প্রত্যাশা করি না। আমাদের মন্ত্রণালয় এটার খোঁজখবর নিচ্ছে, কথা বলছে। আমরা পুরো ঘটনাটি জেনে অবশ্যই যদি কোনো অ্যাকশন নেওয়ার থাকে, সে পদক্ষেপ নেব।’