বিজ্ঞাপন
ইসলামী ব্যাংক : আতঙ্কে প্রতিদিন তুলছে ১২০০ কোটি টাকা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম
বিজ্ঞাপন
চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ও গ্রাহকদের উদ্বেগের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকে ব্যাপক হারে টাকা উত্তোলন চলছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের দাবি, গত দুই কার্যদিবসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে। আরটিজিএস ও এনপিএসবির মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকার নেট তারল্য ঘাটতি তৈরি হলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে দাবি ব্যাংকটির।
রোববার (১৪ জুন) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে শুরু হওয়া বৈঠকটি চলে তিন ঘণ্টারও বেশি সময়। এতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আলতাফ হুসাইন, দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অংশ নেন।
প্রতিনিধি দল ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি, তারল্য চাপ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে গভর্নরকে অবহিত করেন।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আলতাফ হুসাইন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থা, নগদ অর্থের সরবরাহ এবং আগামী দিনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
তিনি জানান, এটি ছিল একটি নিয়মিত ব্যবসায়িক বৈঠক। এতে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ কোন খাতে বিনিয়োগ বা ব্যয় করা হয়েছে এবং অর্থের প্রবাহ কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিষয় কোনো আলোচনা হয়েছি কি না জানতে চাইলে আলতাফ হুসাইন বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি বৈঠকে আলোচিত হয়নি। আমরা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কেবল ব্যবসায়িক বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি ও ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) সংক্রান্ত জটিলতাগুলোকে ব্যবস্থাপনার বাইরের বা রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এ কর্মকর্তারা।
সেলফিন অ্যাপ ও অনলাইন লেনদেনে সাময়িক জটিলতার কথা স্বীকার করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানান, নিজস্ব বা ইন্টারনাল ফান্ড ট্রান্সফারে কোনো সমস্যা নেই। তবে আন্তঃব্যাংক স্থানান্তরের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা থাকায় কিছু সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সেন্ট্রাল অ্যাকাউন্ট ইতিবাচক অবস্থায় আসায় ব্যাংকের আইটি টিম সিস্টেমটি আপগ্রেড করার কাজ করছে এবং দ্রুতই এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা বিতরণের বিষয়টিকে ব্যাংক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং স্থবির হয়ে পড়া চেক ক্লিয়ারিং কার্যক্রমও আজ থেকে পুনরায় সচল করা হয়েছে।
আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আজ যেভাবে সেবা দেওয়া হয়েছে, সেবার মান প্রতিনিয়ত আরও বাড়বে এবং আগামীকাল থেকে গ্রাহকরা আরও উন্নত সেবা পাবেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এর আগেও গ্রাহকরা সাময়িক আতঙ্কে টাকা তুলে নিলেও পরবর্তীতে আবার ব্যাংকেই তা ফেরত এনেছেন, এবারও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষজ্ঞ দল ব্যাংকটির দেওয়া তথ্য ও সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে বলেও জানান তারা।
এদিকে, চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট অসন্তোষ ও আস্থাহীনতার কারণে গ্রাহকদের ব্যাপক টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সহায়তার এ অর্থের মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে আরও ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকা ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কেন তৈরি হলো এই অস্থিরতা?
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তারা দাবি আদায় না হলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি।
গভর্নর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ড ছিল। ওই বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক কারও বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।