Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

সংস্কার না হলে নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়তে পারে

Icon

জাগো বাংলা ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:৫৯ এএম

সংস্কার না হলে নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়তে পারে

বিজ্ঞাপন

সংস্কার সম্পন্ন না হলে নির্বাচন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে। তবে এই ইস্যুতে নাগরিক সমাজ তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত অনুষ্ঠানে সোমবার সিপিডির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান এসব কথা বলেন।

রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ’ নামে একটি কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সঞ্চালনা করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, দেশের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যেতে দেখছি। আমরা রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনাবলি ও নির্বাচনি প্রক্রিয়াগুলো দেখছি। সংস্কার কমিটির সংস্কার প্রস্তাব যেন মাঝপথ থেকে এগোতে পারছে না। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সংস্কারের গন্তব্য কোথায় জানি না। এছাড়া অর্থনীতির সংস্কারের ওপর জোর দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আরও বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আমরা কোন সংস্কারের দিকে নজর দেব? কারণ সংস্কারের একটি বিস্তৃত তালিকা রয়েছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো সংস্কারগুলো হলো বর্তমান সরকারের উদ্যোগে চলমান সংস্কার। তবে এটি কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়। বাস্তব আলোচনায়ও উঠে এসেছে আশঙ্কা। সংস্কারগুলো সম্পন্ন না হলে নির্বাচন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়, আসলে কোন সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা শুনেছি একটি তালিকায় ১৫৮টি সংস্কার ছিল, পরে তা নেমে এসেছে ৮২-তে। রেহমান সোবহান বলেন, প্রফেসর ইউনূস সম্প্রতি বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। আমরা তাকে গুরুত্ব দিয়েই ধরতে চাই। কিন্তু যদি আগামী ছয় মাসে নির্বাচন হয়, তাহলে কোন সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব? যেসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাওয়া হয়েছে, তা আসলে ছয় মাস আগে থেকেই শুরু করা উচিত ছিল। এর পাশাপাশি ৮২টি সংস্কারের ভেতরে কোনো অগ্রাধিকারের তালিকা নেই। কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি অপেক্ষাকৃত কম- তা স্পষ্ট নয়। এভাবে একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করলে তা খুব একটা গুরুত্ব পাবে না। এ বিষয়ে সিরিয়াস হলে অবশ্যই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজাতে হতো। তাছাড়া প্রশ্ন হলো কোন পর্যায়ে একটি সংস্কারকে সত্যিকারের সংস্কার বলা যাবে? শুধু কাগজে লিখে ৩০টি রাজনৈতিক দল সই করে দিলেই কি তা সংস্কার হয়ে গেল? আসল সংস্কারের জন্য প্রয়োজন বিস্তারিত পরিকল্পনা, নির্বাহী আদেশ, অধ্যাদেশ বা আইন, বাজেট ও বাস্তবায়ন কাঠামো। শুধু ঘোষণা দিয়ে এবং কিছু মানুষের সমর্থন নিয়ে সংস্কারের দাবি করা প্রকৃতপক্ষে সংস্কার নয়। সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে রেহমান সোবহান বলেন, একটি কার্যকর সমাজে সংস্কারের দায়িত্ব সংসদের। নির্বাচিত সরকার সংসদে সংস্কার প্রস্তাব আনবে, তা নিয়ে বিতর্ক হবে, আইন হবে, সংসদ নিজেই বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদ তার এই ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দায়িত্ব এখন নাগরিক সমাজের কাঁধে। কিন্তু নাগরিক সমাজও এখনো সমন্বিতভাবে এই দায়িত্ব নিতে পারেনি। অসংখ্য এনজিও ও সংগঠন তাদের নিজস্ব কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু সমষ্টিগত চাপ তৈরি করে সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনের উদ্যোগ নেয়নি। নাগরিক সমাজের ভূমিকা প্রসঙ্গে রেহমান সোবহান বলেন, যদি সত্যিকার সংস্কার পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হয়, তবে নাগরিক সমাজকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। শুধু সেমিনার বা সংলাপ নয়, প্রতিটি জেলায় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সংস্কারের ব্যর্থতা বা বিকৃত বাস্তবায়নকে চিহ্নিত করতে হবে। তিনি বলেন, ৫৪ বছর পরও যদি নাগরিক সমাজ নিজেদের সংগঠিত ও প্রভাবশালী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় তারা কার্যকর অবদান রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, আমি যখন ২৬ বছরের তরুণ, তখন আমরা সমাজের পক্ষ থেকে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন আসলে নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের যৌথ উদ্যোগের ফল ছিল। তাই আজও নাগরিক সমাজের একই ভূমিকা নেওয়ার সময় এসেছে। শুধু সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবক শক্তিতে পরিণত হওয়া দরকার। সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হওয়ার এটাই নাগরিক সমাজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কার প্রস্তাব যেন মাঝপথ থেকে এগোতে পারছে না। এটা কি আকাক্সক্ষা না সক্ষমতার অভাব। নাকি বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত লুকিয়ে ছিল? অন্তর্বর্তী সরকার কী পথ হারিয়েছে? এই প্রশ্নটি আমাদের মনের ভেতর বড় আকারে আসছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে এই মুহূর্তে একটি ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এই ঝড়ের আঘাত আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সামাজিক জীবনসহ সব ক্ষেত্রে অনুভূত হচ্ছে। ঝড় যখন আসে, তখন মানুষ তার সবচেয়ে বড় সম্পদ রক্ষা করার চেষ্টা করে। এ মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে বৈষম্যবিরোধী চেতনা পেয়েছি সেটা রক্ষা করা। সেই বৈষম্যবিরোধী চেতনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা জেগেছে সেটা ধরে রাখা একটা বড় কাজ হিসাবে দেখি। ওই বৈষম্যবিরোধী চেতনা আগামী দিনে রাষ্ট্রযন্ত্রসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে কীভাবে আমরা স্থাপন করব সেই চেষ্টার অংশ হিসাবেই আজকের নাগরিক ঐক্য। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার সংস্কারের জন্য অনেকগুলো কমিটি গঠন করছে। আমারও সৌভাগ্য হয়েছে নিজেও শ্বেতপত্র কাজের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার। তারপরও কেন এই প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হলো? আমরা যেভাবে বর্তমান সরকার তথা সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম, আজকে এই মুহূর্তে সেই উচ্ছ্বাস, সেই উৎসাহ অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংস্কার চলছে। তবে এর গন্তব্য কোথায় কী পৌঁছাবে তা আমরা জানি না। তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বৃত্তায়িত। আমাদের সামনে ১৫ দিন সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু হলে হবে। না হলেও সময় আর বাড়বে না।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিশাল আকাক্সক্ষা নিয়ে শুরু করেছিল। এক বছরে আকাক্সক্ষা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে সেটি মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি বলেন, সংস্কারের ফোকাস কোন জায়গায় তা পরিষ্কার হতে হবে। এর বিপরীতে মানুষের চাহিদা কী ছিল। তিনি বলেন, কয়েকটি চাহিদা ছিল। এর মধ্যে রয়েছে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান, অর্ন্তভুক্তিমূলক নির্বাচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা অন্যতম। তিনি বলেন, শুধু রাজনীতিতে সংস্কার করলে হবে না, অর্থনীতিতেও সংস্কার জরুরি। অলিগার্কনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সবার প্রত্যাশা ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এক বছরে সেই সংস্কার কার্যক্রম কতদূর এগোল? অন্তর্বর্তী সরকার তার অবশিষ্ট সময়ে সংস্কারকে আর কতটুকু এগিয়ে নিতে পারবে? রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সংস্কারের আকাক্সক্ষার কতটুকুই বা প্রতিফলিত হবে? 

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার