বিজ্ঞাপন
অটো রিকশার অঢেল টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শিশুদের গলা কাটছে সোহেলরা
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যার নির্মম ঘটনাটি কেন্দ্র করে খোদ ঢাকা শহরের বুকে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা ও এর চালক-মেকানিকদের লাগামহীন দৌরাত্ম্য নিয়ে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, অপরাধ জগত থেকে আসা এসব অবৈধ অটো মেকানিক ও চালকরা এখন বিপুল অবৈধ আয়ের গরমে ভদ্রপাড়ার নামিদামি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলোর সাথে বসবাস করছে। অথচ তাদের মজ্জাগত অপরাধ প্রবণতা ও পাশবিক মানসিকতার কারণে আজ খোদ নিজ বাসস্থানেই প্রতিবেশীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যার সর্বশেষ নির্মম শিকার শিশু রামিসা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশজুড়ে চলা এসব অবৈধ অটো রিকশার চালকরা মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছে। অথচ লাইসেন্সবিহীন ও সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায় এই বিপুল খাত থেকে রাষ্ট্র কোনো ভ্যাট বা ট্যাক্স পাচ্ছে না; অর্থনৈতিকভাবে দেশ বিন্দুমাত্র উপকৃত হচ্ছে না। উল্টো দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খরচ করে এসব রিকশার ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে। এই বিপুল এবং অনায়াস অবৈধ উপার্জনের জোরে ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতেও এরা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জাঁকজমক পূর্ণ জীবনযাপন করছে। কিন্তু তাদের ভেতরের সামাজিকতাবোধ, নূন্যতম ভদ্রতা বা সভ্য সমাজে চলার যোগ্যতা তৈরি হয়নি। এতে একদিকে সামাজিক ভারসাম্য যেমন বিনষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন প্রতিবেশীরা।
পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সোহেল রানার রিকশা মেকানিক ও অপরাধী ব্যাকগ্রাউন্ড সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নেটিজেনরা তীব্র উপহাস ও ক্ষোভের সাথে বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ও সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। এক ক্ষুব্ধ নেটিজেন লিখেছেন,‘‘এই জীবটি একাধারে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক এবং রিকশা মেকানিক... ব্যাটারি রিকশার কল্যাণে এরা যেভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ (প্রচুর টাকার মালিক) হচ্ছে, এখন তারা ফ্ল্যাটেও থাকা শুরু করেছে... তাই যা ঘটার ছিল তা তো ঘটবেই... দয়া করে এই ব্যাটারি রিকশাচালকদের আরও বেশি বেশি করে সমর্থন দিয়ে যান... যতদিন না আপনার নিজের ছেলে বা মেয়ে এদের ওই 'পবিত্র' রিকশার নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে।’’
সাধারণ মানুষ বলছেন, অটো চালকদের অধিকাংশই চরম মাদকাসক্ত, মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং এদের একটি বড় অংশই পূর্বের সহিংস রাজনৈতিক ও অপরাধজনিত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে এই পেশা বেছে নিয়েছে। রাস্তাঘাটে সামান্য কারণে সংঘাত, স্কুলগামী মেয়েদের ইভটিজিং করা এদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এদের দৌরাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য কারণে এটি বন্ধ না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে।
পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলার প্রধান আসামি যুবলীগ কর্মী সোহেল রানাকে ঘিরে সামনে এসেছে তার অতীত জীবনের হাড়হিম করা নানা অপকর্মের তথ্য। রানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। তার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরাও তার এই জঘন্য অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে রানার আর লেখাপড়া হয়নি। তরুণ বয়সেই সে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ব্যাপক পরিচিতি পায় এবং নিজেকে ‘এসএম রানা’ নামে পরিচয় দিতে শুরু করে। এলাকায় পরিচিতি বাড়াতে সে স্থানীয় বাজারে বড় বিলবোর্ডও টানিয়েছিল। তৎকালীন কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ানবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেম্বার রফিকুল ইসলামের ডান হাত হিসেবে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রানা। স্থানীয় একটি সেতুর নির্মাণ সামগ্রী ও রড চুরির মামলায় আসামি হয়ে সে জেলও খেটেছিল। এছাড়া এলাকায় গরু চুরির মতো অপরাধেও সে বারবার ধরা পড়ে। চার বছর আগে বালুয়া বাসুয়া গ্রামের এক মেয়েকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সে ঢাকায় চলে আসে সোহেল এবং পল্লবীতে রিকশা মেকানিক ও অটো রিকশার ব্যবসার আড়ালে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। গ্রামে ‘এসএম রানা’ নামে পরিচিত এই অপরাধী ঢাকায় এসে ‘সোহেল রানা’ নামে আত্মগোপন করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুবলীগ কর্মী থেকে অটো রিকশা চালক বা মেকানিক- এরপর ঢাকার অভিজাত ফ্ল্যাটে বাস করা এই সোহেল রানারাই আজ সমাজের নতুন ক্ষত। অবৈধ অটো রিকশার কালো টাকা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এই অপরাধীরা যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ ও রাস্তা থেকে নির্মূল না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রামিসাদের মতো নিষ্পাপ শিশুদের জীবন দিতেই হবে। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত রামিসার রক্ত ঝরলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
ফেসবুকে একজন আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘‘যে শহরে বুক ফুলিয়ে চলা এক অপরাধী আর অবৈধ রিকশার কালো টাকার দাপটে একটা ফুটফুটে শিশুর জীবন প্রদীপ নিমেষেই নিভে যায়, সেই শহর কি আসলেই কোনো সভ্য মানুষের বসবাসের যোগ্য? আমরা কোন সমাজে বাস করছি, যেখানে মধ্যবিত্ত বা উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সৎ পথে লড়াই করে বেঁচে থাকে, আর সমাজবিরোধীরা ক্ষমতার দাপটে কিংবা অবৈধ উপার্জনের গরমে ভদ্রপাড়ার ফ্ল্যাট কিনে খোদ প্রতিবেশীদেরই জিম্মি করে ফেলে! আজ রামিসার নিথর দেহটা আমাদের বিচারব্যবস্থা আর প্রশাসনের গাফিলতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।’’