Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি মা ও শিশু হত্যার আড়ালে অদৃশ্য মানসিক যুদ্ধ

Icon

প্রবাস ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি মা ও শিশু হত্যার আড়ালে অদৃশ্য মানসিক যুদ্ধ

বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাংলাদেশি এক পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নীরব মানসিক সংকট, দীর্ঘদিনের চাপ আর বিচ্ছিন্ন জীবনের নতুন নতুন দিক। নিউ সাউথ ওয়েলস এর ক্যাম্পবেলটাউনের রেমন্ড অ্যাভিনিউয়ের সেই বাড়িকে ঘিরে এখনো চলছে পুলিশি তদন্ত।

তবে ঘটনার কয়েক দিন পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার অদৃশ্য যুদ্ধের বিষয়টিও।

পুলিশের জানিয়েছে, ৪৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সুমন আহা সোমবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও দুই শিশুপুত্রকে হত্যার পর জরুরি নম্বরে ফোন করে ঘটনাটি জানান। নিহত দুই শিশুই গুরুতর অটিজম ও বিকাশজনিত জটিলতায় ভুগছিল বলে নিশ্চিত করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী,দুই সন্তানের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার বড় দায়িত্ব বহন করতেন সুমন  আহামেদ নিজেই।

এদিকে ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। কমিউনিটির অনেকে বলছেন, প্রবাস জীবনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবার অনেক সময় চরম মানসিক চাপের মধ্যে থাকলেও তা বাইরে প্রকাশ পায় না। সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, আর্থিক চাপ, দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি এবং একাকীত্ব ধীরে ধীরে পরিবারগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

আইনজীবী জুলফিকার এন. হক বলেন, ‘এই ঘটনাকে শুধু একটি অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন যে মানসিক,শারীরিক ও সামাজিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়,সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারন অনেক পরিবার নীরবে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু সামাজিক সংকোচ,একাকীত্ব কিংবা সহায়তার অভাবে তারা কারও কাছে নিজেদের অবস্থার কথা প্রকাশ করতে পারেন না।’

এই ঘটনা পুরো কমিউনিটির জন্য একটি সতর্কবার্তা। শুধু বিচার নয়, ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি ঠেকাতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা,সামাজিক সংযোগ এবং কমিউনিটি সাপোর্ট আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন অস্ট্রেলিয়ায় অাইন পেশায় নিয়োজিত  থাকা ওই বাংলাদেশী।

সিডনিস্থ সিলেট বিভাগীয় কমিটির নেতা শিপন আহমদ বলেন,‘এখানে অনেক পরিবার আছে যারা বছরের পর বছর শুধু সন্তানের চিকিৎসা,থেরাপি আর দৈনন্দিন পরিচর্যা নিয়েই বেঁচে থাকে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে তারা ভয়ংকর মানসিক চাপে থাকেন।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে , ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার পর দীর্ঘদিন মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুমন  আহামেদ। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন,মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এই ঘটনার পেছনে কতটা ভূমিকা রেখেছে।

তবে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাইকেল মোরোনি ঘটনাটির অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং পুরো কমিউনিটির জন্য গভীর বেদনাদায়ক উল্লেখ করে বলেন, ‘এর আগে পরিবারটিকে ঘিরে পুলিশের কাছে কোনো পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ ছিল না। এবং গ্রেফতারকৃত ব্যাক্তির বিরুদ্ধেও কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।’

মঙ্গলবার ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে মামলাটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়। অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত হননি এবং জামিনের আবেদনও করেননি। আদালত আগামী ১৫ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।

সচেতন মহল জানান,রক্তাক্ত এই ট্রাজেডির পর গোটা অস্ট্রেলিয়াজুড়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পরিবারগুলোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কতটা সহজলভ্য? আর নীরবে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর সংকেত সমাজ কতটা বুঝতে পারছে? রেমন্ড অ্যাভিনিউয়ের সেই বাড়িটি এখনো নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে প্রবাস জীবনের এক অদেখা মানসিক যুদ্ধের গল্প

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার