বিজ্ঞাপন
কথা ছিল বিয়ের, উল্টো একসঙ্গে ৪ ভাইয়ের জানাজা পড়ালেন ভাই
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
বুধবার বেলা ১১টায় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, এতে ইমামতি করেন তাদের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনামুল হক
বুধবার বেলা ১১টায় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, এতে ইমামতি করেন তাদের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনামুল হক
ওমানে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার প্রবাসী চার ভাইদের মরদেহ নিজ গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। ১৫ মে বাড়ি ফিরে যেখানে দুই ভাইয়ের বিয়ের কথা ছিল, সেখানে চার ভাইয়ের একসঙ্গে জানাজা পড়িয়ে দাফন করা হলো। বুধবার (২০ মে) বেলা ১১টায় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন তাদের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনামুল হক। জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিশেষ ফ্রিজারে করে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে বুধবার ভোরে নিয়ে আসা হয়।
মারা যাওয়া চার ভাই হলেন- শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম। তাদের বাবার নাম মৃত জামাল উদ্দিন। রাশেদুল ও শাহিদুল বিবাহিত ছিলেন। সিরাজুল ও শহিদুল ছিলেন অবিবাহিত। তাদের দেখতে লালানগর গ্রামসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ উপস্থিত হন। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না এলাকাবাসী ও স্বজনরা। আহাজারি করছেন স্বজনরা।
সকালে রাঙ্গুনিয়ার বাড়িটিতে গিয়ে চারপাশে কয়েক শ মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ কান্না করছেন। কেউ আবার মারা যাওয়া চার জনের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত। ঘরের ভেতরে গিয়ে আহাজারি করতে দেখা যায় মারা যাওয়া চার জনের মা খাদিজা বেগমকে। সেখানে আহাজারি করছিলেন নিহত রাশেদুলের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও শাহিদুলের স্ত্রী শান্তা আকতারও। তারা দুজনও আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।
সাফিয়া বেগম নামের এলাকার এক নারী বলেন, ‘ঘরে কারও কথা বলার মতো অবস্থাই নেই। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। তাদের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।’
বেলা ১১টায় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নিহতদের একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল হক স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনিই জানাজা পড়ান। জানাজার আগে উপস্থিত সবার সামনে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাইদের আপনারা ক্ষমা করে দিয়েন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ জানাজা শেষে পাশাপাশি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, ‘একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু, আবার চারজনের একসঙ্গে জানাজার ঘটনা এই গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। এটি কতটা মর্মান্তিক তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা এম এ মতিন বলেন, ‘১১ বছর আগে মেজো ভাই প্রথমে ওমানে যান। পরে একে একে অন্য ভাইদের সেখানে নিয়ে যান। তারা ওমানে দুটি গাড়ি ওয়াশিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। কিন্তু একসঙ্গে চার ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়া আসলে মানা যায় না।’
উপজেলার লালানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওমানে মারা যাওয়া চার ভাইকে এক সারিতে কবর করে দাফন করা হয়েছে।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘চার ভাইয়ের মরদেহ ভোরে বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’
গত ১৩ মে রাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ। রয়্যাল ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস গ্রহণের ফলে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৫ মে দুই ভাই অবিবাহিত দুই ভাই একসঙ্গে দেশে ফেরার কথা ছিল। তাই চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে একসঙ্গে বিয়ের কেনাকাটার জন্য বের হয়েছিলেন। এর মধ্যেই পথে গাড়িতে তাদের মৃত্যু হয়। আজ কফিনবন্দি হয়ে এসেছে চার ভাইয়ের মরদেহ। এখন তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।