Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

নিষিদ্ধ শূকরের মাংসও আমদানির চুক্তি করে গেছেন ড. ইউনূস

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

নিষিদ্ধ শূকরের মাংসও আমদানির চুক্তি করে গেছেন ড. ইউনূস

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড. ইউনূস সরকারের স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তির অধীনে কিছু খাদ্যপণ্য আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ শূকরের মাংস ও শূকরজাত পণ্য আনার সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। 

দেশের আমদানিনীতি আদেশ ২০২১-২৪ অনুসারে যে ২৬ ধরনের পণ্য নিষিদ্ধ তার মধ্যে অন্যতম হলো শূকর ও শূকরজাত সব পণ্য। দৈনিক কালবেলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শূকরের মাংস থেকে উৎপন্ন উপজাত (বাই প্রোডাক্ট) পণ্য ব্যবহার করে তৈরি করা পণ্যও আমদানি করা নিষেধ বাংলাদেশে। এটি নিষিদ্ধ হওয়ায় এই পণ্যের বাণিজ্যিক কোনো চাহিদা ও উৎপাদন নেই দেশে। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে কোথাও কোথাও উৎপাদন হলেও সরকারি পর্যায়ে এই পণ্যের চাহিদা বা উৎপাদনের পরিমাণের কোনো তথ্য নেই।

এমন বিধিনিষেধের পরও ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) নামে এই বাণিজ্য চুক্তি করা হয়।

মুসলিম অধ্যুষিত দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই চুক্তি এক ধরনের প্রতারণা বলে মনে করছে বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল। একই সঙ্গে এটি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে বলেও মনে করছে তারা। 

শুধু শূকরের মাংসই নয়, দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও এবং চাহিদা না থাকলেও গরু, মুরগি ও ডেইরিসহ যেকোনো বিভিন্ন ধরনের মাংস আমদানি উন্মুক্ত করতে ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য অনেকগুলো শর্ত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা মেনেও নেয় ড. ইউনূসের সরকার।

এ ছাড়া চুক্তি অনুসারে বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ ছাড়া মার্কিন কোনো কৃষিপণ্য ‘স্যানিটারি পরিদর্শনে’ বাংলাদেশ আটকাতে পারবে না বলেও হাস্যকর শর্ত জুড়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শর্তের কারণে দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদিত হয় এমন পণ্যও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির অনুমোদন দিতে হবে সরকারকে। এ ছাড়া দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ধর্মীয় কারণে যেসব পণ্য নিষিদ্ধ তার অনুমোদনও দিতে হবে, যা একদিকে দেশের বাজারকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় উত্তেজনাও তৈরি করতে পারে।

যদিও কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করার পর এই চুক্তিরও কোনো ভিত্তি নেই। কারণ এই চুক্তি করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের চাপে পড়ে। এ ছাড়া ৬০ দিনের নোটিশে উভয় পক্ষই এই চুক্তিটি বাতিল করতে পারবে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

জানা যায়, দেশের আমদানিনীতি ২০২১-২৪-এর পরিশিষ্ট-১-এর খ-এর ৮ ধারা অনুসারে বাংলাদেশে জীবিত শূকর এবং শূকরজাত সব ধরনের পণ্য নিষিদ্ধ। এর আগের আমদানিনীতিগুলোতেও এসব পণ্য নিষিদ্ধ ছিল।

অথচ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে তার পরিশিষ্ট ২-তে বাংলাদেশের বাজারে বেশকিছু পণ্য প্রবেশ করতে দেওয়ার শর্ত আছে।

এই তালিকার ‘খ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, ব্রাটভুর্স্ট, ক্যাপোকোলা, চরিজো, কিলবাসা, মরটাডেলা, প্যানসেটা, প্রসিউটো এবং সালামি বাজারে প্রবেশগম্য পণ্যের তালিকায় রাখতে হবে। মূলত এগুলো শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য।

অথচ, মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানে শূকরের মাংস উৎপাদন ও ব্যবহার সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য হারাম এই মাংস আমদানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে শূকরের মাংসের উৎপাদন নেই। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও ব্যবহার নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু পাহাড়ি এলাকা বা কিছু সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিবার শূকর পালন করে নিজেরা খাওয়ার জন্য।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে শূকরের মাংসের ব্যবহার নেই। তবে ঢাকার দু-একটি হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিশেষ কাস্টমারদের জন্য রান্না হয়। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চল থেকে ঢাকার ফার্মগেটে কিছু শূকর আসে। এর ক্রেতা ঢাকায় বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি ধর্মের অনুসারীরা। তাই সীমিত এ চাহিদা মেটাতে শূকরের মাংস আমদানির কোনো প্রয়োজনই নেই।

তিনি বলেন, দেশে শুধু শূকর নয়, গরুর মাংসও আমদানি করার অনুমোদন নেই। আগের সরকার যে চুক্তি করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ বিবেচনায় এসব পণ্য তালিকায় রেখেছে। তারা তো চাইবেই তাদের পণ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি বাড়ুক।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে শূকরের মাংস রপ্তানি হয় না। পাহাড়ি এলাকায় কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের নিজেদের খাওয়ার জন্য শূকর পালন করে থাকে। বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে এ পশুর মাংস রপ্তানির কোনো সুযোগ নেই।

বেশ কয়েক বছর আগে র‌্যাব-৪ সাভারে প্রাণিখাদ্য তৈরির কেবিসি অ্যাগ্রো কারখানাকে নিষিদ্ধ শূকরের চর্বি, হাড় ও মাংস আমদানি করা ও সেগুলো দিয়ে মাছ ও মুরগির খাবার তৈরি করে বাজারজাত করার অপরাধে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছিল।

বিভিন্ন তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র শূকরের মাংস রপ্তানিতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ। মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) এবং মার্কিন মাংস রপ্তানি ফেডারেশনের (ইউএসএমইএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭২ টন শূকরের মাংস রপ্তানি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

আগের বছর ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় তা ২ শতাংশ বেশি, যার রপ্তানি মূল্য ১.৩৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৫১১ টন এবং এর মূল্য ৬৭৮.৮ মিলিয়ন ডলার।

চুক্তি সইয়ের প্রতিক্রিয়া: বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত আসে, এমন কাজ বা নীতি যে সরকারই করুক না কেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না। প্রত্যেক দেশের মানুষেরই ধর্মীয় বিশ্বাস থাকে, সেটাকে মর্যাদা দিতে হয়। এটা সারা বিশ্বেই রয়েছে। আমেরিকাতেও আছে।

এটা এখন বর্তমান সরকারের ওপর নির্ভর করছে। তারা যদি মনে করে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, তবে জনগণ যেটা ভালো মনে করে, সেটাই তারা করবে। আমরাও যেহেতু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি, সেই দায়িত্ব থেকে আমরা জনগণের কথাই বলব। এটা যেহেতু জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত আসে, তাই এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশের অন্যতম ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি আবদুল্লাহ ফিরোজী বলেন, ড. ইউনূস সরকারের আমেরিকানির্ভর কার্যক্রমগুলো আমরা কোনোভাবেই পছন্দ করি না। তিনি আমেরিকার সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করেছেন, তা জাতির কাছে একেবারেই অস্পষ্ট।

চুক্তির বিষয়ে আমরা বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু শুনি। কিন্তু সরকার বিষয়গুলো জাতিকে জানায়নি। এটা চরম নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজ।

তিনি আরো বলেন, জাতির একটা প্রত্যাশা ছিল, যেহেতু স্বৈরাচারের পতনের পর নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে দায়িত্ব নিয়েছেন তাই মুসলিম জনগণের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগে এবং ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ বা চুক্তি তিনি (ড. ইউনূস) করবেন না— এটা আমাদের আশা ছিল। কিন্তু তিনি সেই আশা সম্পূর্ণরূপে ভঙ্গ করেছেন। দেশের মুসলিম জনগণের সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন। আমেরিকার সঙ্গে তিনি ইসলামবিরোধী এবং দেশবিরোধী অনেক চুক্তি করেছেন। আমরা চাই না ইসলামবিরোধী কোনো শক্তির সঙ্গে কোনো চুক্তি করা হোক। বর্তমান সরকারের প্রতি দাবি, সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ধর্মীয় ও দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করা হোক।

সরকার যা বলছে: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানের বরাত দিয়ে কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সিদ্ধান্ত হলে শূকরের মাংস নিষিদ্ধ ছিল এটা নিষিদ্ধই থাকবে। নতুন আমদানি নীতিতেও এটা নিষিদ্ধই থাকছে। চুক্তিতে যাই থাক তাতে সমস্যা নেই।

পর্যাপ্ত উৎপাদন তবুও মাংস আমদানির সম্মতি: এ ছাড়া দেশে পর্যাপ্ত গরু ও মুরগির মাংস উৎপাদন হওয়ায় বিদেশ থেকে কোনো প্রকার মাংস আমদানিরই অনুমোদন নেই দেশে। এর আগে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বহু দেশ বাংলাদেশে মাংস রপ্তানি করার চেষ্টা করলেও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এসব প্রাণিজ খাদ্য পর্যাপ্ত উৎপাদন সত্ত্বেও এসব পণ্য আমদানি উন্মুক্ত করার শর্তেও রাজি হয়েছে বাংলাদেশ।

চুক্তির অনুচ্ছেদ ১.৫-এর ২ অনুসারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের মাংস ও পোলট্রি (অভ্যন্তরীণ অঙ্গসহ), মাংস ও পোলট্রি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও পোলট্রি, সিলুরিফরমিস (আঁশ ছাড়া মাছ) এবং ডিম পণ্য আমদানির অনুমতির উদ্দেশে মার্কিন কৃষি দপ্তরের (ইএসডিএ) খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন পরিষেবা (এফএসআইএস) কর্তৃক তত্ত্বাবধানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যার মধ্যে কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

একই অনুচ্ছেদের ৩নং ধারায় বলা হয়, বাংলাদেশ এফএসআইএসের মাংস, পোলট্রি ও ডিম পণ্য পরিদর্শন সরাসরি গ্রহণ করবে, যেন এফএসআইএস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মাংস, পোলট্রি, সিলুরিফরমিস এবং ডিম পণ্য উৎপাদনকারী সব ফেডারেল পরিদর্শিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকবে এবং এটিকে বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য যোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের সরকারি তালিকা হিসেবে গণ্য করবে।

অথচ গত অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময়ই বলা হয়েছে, মাংস আমদানির কোনো আগ্রহ সরকারের নেই। ওই সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গত বছরের ২৬ আগস্ট লিখিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিদেশ থেকে মাংস আমদানির খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাংলাদেশ সরকার প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, দেশীয় খামারিদের স্বার্থরক্ষা এবং জনগণকে নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস সরবরাহে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এ মুহূর্তে বিদেশ থেকে মাংস আমদানির কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। ‘ব্রাজিল বাংলাদেশকে কেজিপ্রতি ১২০ টাকায় গরুর মাংস সরবরাহ করবে’—এমন খবরের ভিত্তিতে ওই বিবৃতি দেওয়া হয় তখন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার