বিজ্ঞাপন
রূপপুর থেকে কি পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব?
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২ পিএম
বিজ্ঞাপন
পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে যাত্রা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ। কিন্তু এই খবর আসার পর থেকেই অনেকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে— এই ইউরেনিয়াম দিয়ে কি পরমাণু অস্ত্র বা বোমা বানানো সম্ভব? রূপপুরের এই প্রযুক্তি কি চাইলেই যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা যাবে? আজ আমরা সহজ ভাষায় এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব।
ইউরেনিয়াম কী?
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বোমা, দুটি তৈরি করতেই প্রয়োজন ইউরেনিয়াম। প্রকৃতি থেকে আমরা যে ইউরেনিয়াম পাই, এতে মূলত দুটি আইসোটোপ থাকে: ইউ-২৩৮ এবং ইউ-২৩৫। সমস্যা হলো, প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামের ৯৯ শতাংশের বেশিই হলো ইউ-২৩৮, যা বিদ্যুৎ তৈরির জন্য খুব একটা কার্যকর নয়। আসল কাজ করে ইউ-২৩৫, যা প্রকৃতিতে থাকে মাত্র ০.৭ শতাংশ।
এই ০.৭ শতাংশকেই ব্যবহারোপযোগী করার প্রক্রিয়াকে বলে ‘সমৃদ্ধকরণ’ বা এনরিচমেন্ট। সেন্ট্রিফিউজ নামের যন্ত্রে ইউরেনিয়াম গ্যাসকে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরানো হয়। যেহেতু ইউ-২৩৫ হালকা, তাই ঘূর্ণনের ফলে এটি আলাদা হয়ে যায় এবং এভাবে এর ঘনত্ব বাড়ানো হয়।
বিদ্যুৎ বনাম বোমা: পার্থক্য কোথায়?
মূলত সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয় আপনি ঘরে আলো জ্বালবেন নাকি কোনো শহর ধ্বংস করবেন। রূপপুরের মতো বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয় মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। এই মাত্রার ইউরেনিয়াম দিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন চালানো সম্ভব, যা থেকে বছরের পর বছর তাপ এবং বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কিন্তু এটি দিয়ে কোনোভাবেই বিস্ফোরণ ঘটানো বা বোমা বানানো সম্ভব নয়।
গবেষণা রিঅ্যাক্টরের জন্য সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর একটি পারমাণবিক বোমা বানাতে হলে ইউরেনিয়ামকে সাধারণত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হয়। একে বলা হয় ‘ওয়েপন গ্রেড’ বা অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম। ৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছানোর ব্যবধান আকাশ-পাতাল। রূপপুরের জন্য যে জ্বালানি রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে, তা কেবল বিদ্যুৎ তৈরির উপযোগী করেই বানানো।
রূপপুরে আসলে কী ঘটবে?
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায়। এখানে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি বাষ্প হয়ে টারবাইন ঘোরাবে এবং বিদ্যুৎ তৈরি হবে। এটি একটি অত্যন্ত ধীর এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, বোমার ক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকে এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে সব শক্তি নির্গত করা। রূপপুরের চুল্লিতে সেই প্রযুক্তি বা পরিবেশের কোনোটিই নেই।
আন্তর্জাতিক নজরদারি
এ ছাড়া আছে কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম। রূপপুর প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কড়া নজরদারিতে। রাশিয়া থেকে আসা প্রতিটি ফুয়েল রড এবং ইউরেনিয়ামের হিসাব রাখা হয়। বাংলাদেশ এই ইউরেনিয়ামের বেসামরিক ব্যবহারের জন্য চুক্তিবদ্ধ। ফলে এখান থেকে প্রযুক্তি বা জ্বালানি সরিয়ে গোপনে অস্ত্র বানানো বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক— দুই দিক থেকেই অসম্ভব।
সুতরাং, রূপপুর নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এটি কোনো ধ্বংসের হাতিয়ার নয়, বরং দেশের জ্বালানি সংকট মেটানোর একটি বড় মাধ্যম। এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ যদি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত।