বিজ্ঞাপন
নির্বাসিত সরকার গঠনে কি নীরবে সমর্থন দিচ্ছে ভারত?
২৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪১ এএম
বিজ্ঞাপন
দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে হাজির হতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। শুক্রবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
‘বাংলাদেশ অ্যাট দ্য ক্রসরোডস’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করছে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস ক্লাবস।
অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে শেখ হাসিনাকে ‘বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিচয় নিয়ে ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছেন।
এই ঘোষণার পর ভারতের কর্তৃপক্ষ নীরবে কোনো ‘নির্বাসিত সরকার’ গঠনের প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জল্পনা।
আগের মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হওয়া সত্ত্বেও একই আমন্ত্রণপত্রে মো. আলী আরাফাতকে ‘তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী’ এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে ‘শিক্ষামন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান হওয়ার বিষয়টি টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন নওফেল। তবে সেই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা সরাসরি উপস্থিত থাকবেন, নাকি ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন—তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
অল ইন্ডিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ীও অনুষ্ঠানটি হবে বলে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠানটি শুরু হবে এবং ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার) ও ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার ওয়েবসাইটে (www.fccsouthasia.com) তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন
এসব ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—ভারতের প্রশাসন কিংবা দেশটির নাগরিক সমাজের কোনো অংশ কি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবে সহায়তা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাবেক বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার আইনি অবস্থান কী-তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেনি ভারত।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি নিয়মিত ভিসায় দিল্লিতে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকার কথা।
এই সাবেক কূটনীতিক আরও বলেন, তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের মতো উদাহরণ ইতিহাসে আছে বটে, তবে সেগুলো ব্যতিক্রমী এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তিনি বলেন, আমন্ত্রণপত্রে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—এটি ইঙ্গিত দেয় যে আয়োজকেরা হয়তো ভারতের রাজনৈতিক মহল থেকে কোনো ধরনের সংকেত পেয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। বিশ্বনেতাদের মধ্যে প্রথম দিকেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
গত বছরের এপ্রিলে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার সাক্ষাৎও হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মধ্যে নিরপেক্ষ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিও ঢাকায় এসে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক করেন।
এক সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, এসব যোগাযোগ স্পষ্টভাবে দেখায় যে ভারত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকেই বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
নির্বাসিত সরকার কী
নির্বাসিত সরকার বলতে এমন রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে বোঝায়, যারা নিজেদের কোনো দেশের বৈধ সরকার বলে দাবি করে, কিন্তু যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম চালায়।
এই ধরনের সরকার টিকে থাকার জন্য মূলত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুপরিচিত উদাহরণ হলো, তিব্বতের নির্বাসিত সরকার, যা ‘সেন্ট্রাল তিবেটান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ নামেও পরিচিত এবং ভারতের ধর্মশালায় অবস্থিত।
কূটনৈতিক প্রভাব
এর আগে রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা ও বিবিসিসহ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমকে ইমেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
সেসব সাক্ষাৎকারের পর ব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় ঢাকা, ভারতে বসে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
এক বিশ্লেষক বলেন, শেখ হাসিনা যদি এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন, তাহলে সেটিকে ভারত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন হিসেবে দেখা হবে এবং তা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে, বিদেশ—বিশেষ করে ভারত থেকে—শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তারা সমর্থন করে না।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি অনুষ্ঠান বাংলাদেশের জন্য ভুল বার্তা দিতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির বিষয়ে জানেন না।
শেখ হাসিনা যদি অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হন, সে ক্ষেত্রে ঢাকা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এমন প্রশ্নে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনায়।
বিজ্ঞাপন