বিজ্ঞাপন
এয়ারলাইন্স ব্যবসায় নামতে চান বশিরউদ্দিন, নিয়েছেন ট্রেড লাইসেন্স
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
অন্তর্বর্তী সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের মালিকানাধীন আকিজ বশির গ্রুপ এবার এভিয়েশন ব্যবসা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রেড লাইসেন্সও নিয়েছেন। লাইসেন্স নিয়েই আবেদন করেছেন এভিয়েশন ব্যবসা করার।মন্ত্রী সমমর্যাদার উপদেষ্টার পদে থেকে ব্যবসার জন্য নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া সংবিধানিকভাবে কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন আকিজ বশির গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ বশিরউদ্দিন। পরে ১৫ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও পান।
বেবিচকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২ মার্চ তার মালিকানাধীন আকিজ বশির গ্রুপ বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর চেয়ারম্যানের কাছে এভিয়েশন ব্যবসা করার জন্য একটি অভিপ্রায়পত্র (লেটার অব ইন্টেন্ট) জমা দেয়। সেখানে তার প্রতিষ্ঠান বি-২ ক্যাটাগরির—হেলিকপ্টারভিত্তিক—একটি এয়ারলাইন্স তৈরির পরিকল্পনা জানায়। দেশীয় রুটে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের সিডিউল ও নন-সিডিউল উভয় ধরনের ফ্লাইট পরিচালনার কথা বলা হয়।
লেটার অব ইন্টেন্টে জানানো হয়, গ্রুপটি দীর্ঘদিন ধরে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স লিমিটেডের মাধ্যমে হেলিকপ্টার পরিচালনা করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই 'আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বেবিচক থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর ১১ মার্চ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। ট্রেড লাইসেন্স নম্বর TRAD/DNCC/039917/2024। এতে ব্যবসার ধরণ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমদানি, এভিয়েশন সার্ভিস, রপ্তানি’। এতে উপদেষ্টার ছবিও সংযুক্ত রয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, এভিয়েশন ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিককে বেবিচকের সদস্য (ফ্লাইট সেফটি রেগুলেশন-এফএসআর) -এর সঙ্গে বৈঠকে বসতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার পর আকিজ বশির এভিয়েশনের মালিক হিসেবে মিটিংয়ে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন খোদ উপদেষ্টা শেখ বসিরউদ্দিন।
বৈঠকের পর ১৮ মার্চ বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেডের নামে এভিয়েশন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চেয়ে আবেদন করে গ্রুপটি। আবেদনে বেবিচককে তারা জানায়, অপারেশন শুরুর জন্য পর্যাপ্ত পাইলট নিয়োগ দেওয়া এবং ও অফিস নেওয়ার সম্পন্ন করেছে তারা।
বর্তমানে আকিজ বশির এভিয়েশনের লাইসেন্স আবেদনটি চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই পর্যায়ে আছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভিয়েশন খাত এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে লাইসেন্স দেওয়া, এওসি অনুমোদন, নিরাপত্তা সার্টিফিকেশন, রুট অনুমতি, অপারেশনাল ছাড়পত্র—সবই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং সবকিছুই বেবিচক ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের অধীন। উপদেষ্টা হিসেবে উভয় জায়গায়ই শেখ বশিরউদ্দিনের নীতিগত প্রভাব আছে। একইসঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আবেদন সেই প্রতিষ্ঠানের কাছেই বিচারাধীন, যাআর দায়িত্বপ্রাপ্ত তিনি নিজেই। এটি স্পষ্টভাবে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্য ও এভিয়েশন খাত–সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একই খাতে ব্যক্তিগত ব্যবসার লাইসেন্স চাওয়া—স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ১৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে মন্ত্রীরা পদে থাকার সময় অন্য কোন লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না। এর মানে বুঝানো হয় ব্যবসা করতে পারবেন না। ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করার প্রস্তুতি নেওয়াও বাধা রয়েছে সংবিধানে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদটি মন্ত্রী সমমর্যাদার।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারী কর্ম কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ''অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়, এইরূপ কোন পদে নিযুক্ত বা কর্মরত ব্যক্তি কোন লাভজনক পদ কিংবা বেতনাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় বহাল হইবেন না কিংবা মুনাফালাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোন কোম্পানী, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বা পরিচালনায় কোনরূপ অংশগ্রহণ করিবেন না।''
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বাংলাদেশে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে যুক্ত হওয়া সংবিধানের নীতি ও শপথবিধির পরিপন্থী এবং এটি স্পষ্ট স্বার্থসংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) হিসেবে বিবেচিত হয়। সংবিধানের ১৪৭(২) অনুচ্ছেদে উপদেষ্টা জনগণের অধিকার রক্ষার শপথ নেন এবং ২১(১) অনুচ্ছেদে জনসেবাকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। ফলে, একজন উপদেষ্টা নিজের নামে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স নিতে পারেন না। একইভাবে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় ওই মন্ত্রণালয়ের অধীন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে এভিয়েশন ব্যবসার লাইসেন্স চাওয়া সরকারি নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বার্থসংঘাত-বিরোধী নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, একজন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে সততা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অতএব, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের নামে ব্যবসা পরিচালনা বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তরে ব্যবসার লাইসেন্স আবেদন করা আইনগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য।
এভিয়েশন এক্সপ্রেসের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, উপদেষ্টা হওয়ার অনেক আগেই তিনি হেলিকপ্টারের মালিক ছিলেন।
তিনি জানান, গত ১৪ বছর ধরে তার একটি হেলিকপ্টার রয়েছে এবং এই পুরো সময়জুড়ে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স তার হেলিকপ্টারটি পরিচালনা করে আসছে। আর্থিক চাপের কারণে একসময় তার দুটি হেলিকপ্টারের একটি বিক্রি করতে বাধ্য হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বশিরউদ্দিন বলেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি নিজের কোম্পানি গঠন করেছিলেন এবং সে কারণেই আলাদা কোম্পানি করার সিদ্ধান্ত নেন। কেউ যদি তাকে দোষারোপ করতে চায়, তাতে তার কোনো আপত্তি নেই। তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো ও চরিত্র হননের একটি সুস্পষ্ট চেষ্টা চলছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টার এ ধরনের স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, বিষয়টি হতাশাজনক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের হাতে ন্যস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করপোরেট বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি এই প্রথম নয়। এই সরকারের কাছ থেকে সুশাসনের প্রত্যাশা যারা করেছিলেন, তাদের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
একই কারণে লাইসেন্স বাতিল হয় সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার বাবার
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এমন একটি ঘটনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বাবা মো. বিল্লাল হোসেনের ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
সেবছরের মার্চে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদনের প্রেক্ষিতে কুমিল্লার জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেসার্স ইসরাত এন্টারপ্রাইজ (ওই লাইসেন্স) অনুমোদন লাভ করে আসিফের বাবা। পরে দেশব্যাপী এই লাইসেন্স নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কথা স্বীকার করে ফেসবুকে পোস্ট দেন আসিফ মাহমুদ।
বিজ্ঞাপন