Logo
Logo
×

ইসলাম

রাতে যদি ঘুম না আসে তাহলে যে আমল করবেন

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৫৫ এএম

রাতে যদি ঘুম না আসে তাহলে যে আমল করবেন

সারা দিনভর দৌড়ঝাঁপ শেষে রাত যখন নীরবতায় ডুবে যায়, তখন চাই শান্তির ঘুম। কিন্তু কখনো কখনো অজানা অস্থিরতা, চিন্তা আর ব্যস্ততার ভার আমাদের চোখের পাতায় ঘুম নামতে দেয় না। নিস্তব্ধ রাতও তখন ভারী মনে হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য এমন কিছু আমল দিয়েছেন, যা হৃদয়কে শান্ত করে, মনকে প্রশান্ত করে এবং নিদ্রাকে সহজ করে দেয়। ঘুমহীন রাতগুলোতে তার দরবারে ফিরে যাওয়াই হয় সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক আশ্রয়।

ঘুমের জন্য প্রশান্ত হৃদয় ও মন খুবই প্রয়োজন। আর মানুষের হৃদয়কে প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ করে দেওয়ার জন্য জিকিরের বিকল্প নেই। আর এ জিকিরের কথা বলেছেন বিশ্বনবী (সা.)। যদি কেউ বিছানায় ঘুমাতে গিয়ে জিকির করে তবে তার ঘুম এসে যাবে। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে—

হজরত আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন:

النَّوْمُ عِنْدَ الذِّكْرِ مِنَ الشَّيْطَانِ، إِنْ شِئْتُمْ فَجَرِّبُوا، إِذَا أَخَذَ أَحَدُكُمْ مَضْجَعَهُ وَأَرَادَ أَنْ يَنَامَ فَلْيَذْكُرِ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ

‘আল্লাহর জিকির করলে শয়তানের পক্ষ থেকে ঘুম এসে যাবে। তোমরা চাইলে অনুশীলন করে দেখতে পারো। তোমাদের কেউ যখন শয্যাগত হয়ে ঘুমাতে ইচ্ছা করে তখন সে যেন মহামহিম আল্লাহর জিকির করে।’ (আদাবুল মুফরাদ ১২২০)

হাদিসে উল্লেখিত জিকির বলতে যে কোনো জিকির করা যেতে পারে। জিকিরের আমলগুলো হলো—

১। سُبْحَانَ الله— সুবহানাল্লাহ

২। اَلْحَمْدُ لله— আলহামদুলিল্লাহ

৩। لَا اِلَهَ اِلَّا الله— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

৪। اَللهُ اَكْبَر— আল্লাহু আকবার

৫। سُبْحَانَ اللهِ وَ بِحَمْدِهِ— সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি

৬। سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْم— সুবাহানাল্লাহিল আজিম

৭। কুরআন তেলাওয়াত

৮। নফল নামাজ ইত্যাদি।

ঘুমানোর আগে নবীজি (সা.) জিকিরের আমলের পাশাপাশি আরও যেসব দোয়া পড়তেন—

১. হজরত হুযাইফাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর ইচ্ছা করলে বলতেন—

‏ بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا

উচ্চারণ: ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া।’

অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি তোমার নামেই মরি ও বাচি।’ (আদাবুল মুফরাদ ১২১৭)

২. হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) যখন শয্যা গ্রহণ করতেন তখন বলতেন—

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا، وَكَفَانَا وَآوَانَا، كَمْ مَنْ لا كَافٍّ لَهُ وَلا مُؤْوِيَ‏

উচ্চারণ: আলহামদুল্লিাহিল্লাজি আত্বআমানা ওয়া সাক্বানা ওয়া কাফানা ওয়া আওয়ানা; কাম মান লা কাফফিন লাহু ওয়া লা মুওয়িয়া’

অর্থ: ‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের পানাহার করিয়েছেন, আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। কত লোক আছে যাদের কোনো পৃষ্ঠপোষকও নাই, আশ্রয়দাতাও নাই।’ (আদাবুল মুফরাদ ১২১৮, মুসলিম ৬৬৪৬)

৩. হজরত জাবের (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা আলিফ-লাম-মীম তানযিল (সুরা সাজদা) এবং তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক (সুরা মুলক) না পড়ে ঘুমাতেন না। (আদাবুল মুফরাদ ১২১৯)

এই সুরা দুইটি কুরআন মাজিদের অন্য সব সুরার তুলনায় সত্তর গুণ সওয়াবের মর্যাদা লাভের অধিকারী। কোনো ব্যক্তি এই সুরা দুইটি পড়লে তার জন্য এর বিনিময়ে ৭০টি নেকি লেখা হয়। এর অসিলায় তার মর্যাদা সত্তর গুণ বেড়ে যায় এবং এর দ্বারা সত্তরটি গুনাহ মাফ করা হয়।’ (নাসাঈ, দারিমি, মুসতাদরেকে হাকেম, ইবনে আবি শায়বা)

৪. তোমাদের কেউ তার বিছানায় ঘুমাতে এলে , ‘আমার প্রতিপালক মহাপবিত্র। তোমার নামে আমার পার্শ্বদেশ বিছানায় রাখলাম এবং তোমার নামে তা উঠাব। যদি তুমি আমার জান রেখে দাও তবে তাকে ক্ষমা করো। আর যদি তাকে ছেড়ে দাও তবে তার হেফাজত করো, যেরূপ তুমি তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের হেফাজত করে থাকো’।

৪. হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ঘুমাতে বিছানায় গেলে সে যেন তার পরিধেয় বস্ত্রের নিম্নাংশ দ্বারা তার বিছানাটা ঝেড়ে নেয় এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করে। কারণ সে জানে না যে, তার অনুপস্থিতিতে তার বিছানায় কি পতিত হয়েছে। সে যখন বিছানায় শোবে তখন যেন তার ডান কাতে শোয় এবং বলে-

سُبْحَانَكَ رَبِّي، بِكَ وَضَعْتُ جَنْبِي، وَبِكَ أَرْفَعُهُ، إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَاغْفِرْ لَهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: ‘সুবহানাকা রাব্বি; বিকা ওয়াদাতু ঝানবি; ওয়া বিকা আরফাউ’হু; ইন আমসাকতা নাফসি ফাগফিরলাহা; ওয়া ইন আরসালতাহা ফাহফাজহা বিমা তাহফাজ বিহি ইবাদাকাস সালিহিন।’

অর্থ: ‘আমার প্রতিপালক মহাপবিত্র। তোমার নামে আমার পার্শ্বদেশ বিছানায় রাখলাম এবং তোমার নামে তা উঠাব। যদি তুমি আমার জান রেখে দাও তবে তাকে ক্ষমা করো। আর যদি তাকে ছেড়ে দাও তবে তার হেফাজত করো, যেরূপ তুমি তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের হেফাজত করে থাকো’ (আদাবুল মুফরাদ ১২২৯)

৫. হজরত বারাআ ইবনে আজেব (রা.) বলেন, নবি (সা.) বিছানাগত হয়ে ডান কাতে শুয়ে যেতেন। এরপর বলতেন-

اللَّهُمَّ وَجَّهْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَأَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَهْبَةً وَرَغْبَةً إِلَيْكَ، لاَ مَنْجَا وَلاَ مَلْجَأَ مِنْكَ إِلاَّ إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ওয়াঝহাতু ওয়াঝহি ইলাইকা; ওয়া আসলামতু নাফসি ইলাইকা; ওয়াঝাতু জাহরি ইলাইকা; রাহবাতা ইলাইকা; লা মানঝা ওয়া লা মালঝা মিনকা ইল্লা ইলাইকা; আমানতু বিকিতাবিকাল্লাজি আনযালতা; ওয়া নাবিয়্যিকাল্লাজি আরসালতা।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার মুখ তোমার দিকে ফিরিয়ে দিলাম, আমাকে তোমার কাছে সোপর্দ করলাম এবং তোমার রহমতের আশা ও তোমার শাস্তির ভয় সহকারে আমার পিঠ তোমার আশ্রয়ে সোপর্দ করলাম। তোমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার এবং নাজাত পাওয়ার তুমি ছাড়া আর কোনো ঠিকানা নাই। তুমি যে কিতাব নাজিল করেছে এবং যে নবি পাঠিয়েছো আমি তার উপর ঈমান এনেছি।’ নবী (সা.) বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি রাতে এই দোয়া পড়লে, এরপর মারা গেলে সে দ্বীন ইসলামের ওপর মারা গেল।’ (আদাবুল মুফরাদ ১২২৫)

৬. হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিছানায় গিয়ে বলতেন-

اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ، وَرَبَّ كُلِّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، مُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ كُلِّ ذِي شَرٍّ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ، أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنِّي الدَّيْنَ، وَأَغْنِنِي مِنَ الْفَقْرِ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা রাব্বাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি; ওয়া রাব্বা কুল্লি শাইযিন; ফালিক্বাল হাব্বি ওয়ান নাওয়া; মুনযিলাত্তাওরাতি ওয়াল ইনঝিলি ওয়াল কুরআনি; আউজুবিকা মিন কুল্লি জি শাররি আনতা আখিজা বিনাসিয়াতিহি; আনতাল আউয়ালু ফালাইসা ক্বালবিকা শাইয়িন; ওয়া আনতাল আখিরু ফালাইসা বাঅদাকা শাইউন; ওয়া আনতাজ জাহিরু ফালাইসা ফাউক্বাকা শাইউন; ওয়া আনতাল বাত্বিনু ফালাইসা দুনাকা শাইউন; আক্বদা আন্নিদ দাইনা; ওয়া আগনিনি মিনাল ফাক্বরি।’

অর্থ: হে আল্লাহ! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রভু, প্রতিটি জিনিসের প্রভু, বীজ ও অংকুরের প্রভু, তাওরাত, ইনজিল ও কুরআন নাজিলকারী! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি প্রতিটি ক্ষতিকর বস্তুর ক্ষতি থেকে, আপনিই এগুলোর নিয়ন্ত্রক। আপনিই আদি, আপনার আগে কিছুর অস্তিত্ব নাই। আপনিই অন্ত, আপনার পরে কিছু নাই। আপনি প্রকাশমান, আপনার ঊর্ধ্বে কিছু নাই। আপনি লুকায়িত, আপনার অগোচরে কিছু নাই। আপনি আমার পক্ষ থেকে আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিন এবং আমাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিন।’ (আদাবুল মুফরাদ ১২২৪)

দিন শেষে ক্লান্তি অনেক সময়ই চোখে ঘুম আনতে চায় না। চিন্তা, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা মনকে ভারী করে তোলে। কিন্তু আল্লাহর জিকির, দোয়া এবং নবীজির (সা.) শেখানো আমলগুলো মানুষের অন্তরে এনে দেয় প্রশান্তির নরম পরশ। যখন একজন মুমিন নিজের সব দুর্বলতা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে ঘুমোতে যায়, তখন তার বুক হালকা হয়, মন শান্ত হয়, আর ঘুমও সহজ হয়ে আসে। তাই নিদ্রাহীন রাতগুলোতে ওষুধ নয়—আল্লাহর স্মরণই হোক আমাদের প্রথম আশ্রয়। কারণ, হৃদয়ের প্রকৃত সান্ত্বনা কেবল তার কাছেই।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার