Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

সুখী জীবনের জন্য বিয়ের আগে যে ৭টি নববি প্রস্তুতি জানা জরুরি

Icon

ইসলাম ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

সুখী জীবনের জন্য বিয়ের আগে যে ৭টি নববি প্রস্তুতি জানা জরুরি

বিজ্ঞাপন

ইসলামে বিয়ে কেবল একটি সামাজিক বন্ধন নয়, বরং ঈমানের পূর্ণতা ও অত্যন্ত বরকতময় এক পবিত্র ইবাদত। সুস্থ ও প্রশান্তিময় মানবসমাজ গঠনে বিয়ের বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সামর্থ্য হলে বিলম্ব না করে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একটি সফল ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য বিয়ের আগে সঠিক মানসিক, নৈতিক ও পারিবারিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামর্থ্য থাকলে দ্রুত বিয়ের নববি নির্দেশ

আল্লাহর রসুল (সা.) যুবসমাজকে বিবাহের সামর্থ্য অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ের তাগিদ দিয়েছেন, যা চরিত্র রক্ষা ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতার বড় মাধ্যম। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন—

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ

‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য রয়েছে, তার বিবাহ করা উচিত। কারণ বিবাহ দৃষ্টিশক্তিকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যার (আর্থিক বা শারীরিক) সামর্থ্য নেই, সে যেন সিয়াম (রোজা) পালন করে। কেননা রোজা তার যৌবনের উত্তাপ প্রশমিত করে।’ (বুখারি ৫০৬৫, মুসলিম ১৪০০)

বিয়ের জন্য ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তারিখ বেঁধে দেয়নি, সামর্থ্য হওয়াই হলো মূল বিষয়। আর এই বরকতময় জীবনের সূচনার জন্য বিয়ের আগে জরুরি ৭টি প্রস্তুতির বিবরণ নিচে দেওয়া হলো—

১. নিজেকে মুত্তাকি ও চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলা

বিবাহইচ্ছুক প্রত্যেক নারী-পুরুষের সর্বপ্রধান প্রস্তুতি হলো বিয়ের আগেই নিজেকে পরহেজগার, খোদাভীরু এবং সকল প্রকার পাপকাজ থেকে মুক্ত মানুষ হিসেবে তৈরি করা। আমরা সবাই আশা করি যেন আমাদের জীবনসঙ্গী ফেরেশতার মতো চরিত্রবান হন। তাই অপরকে ভালো পাওয়ার আগে নিজেকে সর্বাঙ্গীনভাবে ভালো করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে একটি সাধারণ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (যদিও পরীক্ষা বা বিশেষ উদ্দেশ্যে কখনো ব্যতিক্রম হতে পারে)—

الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ

‘দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য। আর চরিত্রবান বা পবিত্র নারী পবিত্র পুরুষের জন্য এবং চরিত্রবান বা পবিত্র পুরুষ পবিত্র নারীর জন্য।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ২৬)

২. নেকসঙ্গী পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত দোয়া

বিয়ের আগেই পরম করুণাময়ের দরবারে আকুতি জানাতে হবে যেন তিনি একজন উত্তম, সৎ ও চক্ষুশীতলকারী সঙ্গী দান করেন। এ ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত কার্যকর ও মহিমান্বিত দোয়া প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায়, চলনে-বলনে বেশি বেশি পাঠ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়ার শিক্ষা দিয়ে বলেন—

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণ: ‘রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াঝিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিও ওয়াঝআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।’

অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় এবং আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম/নেতা বানিয়ে দিন।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭৪)

আরও পড়ুন
৩. দ্বীনদার ও অল্পেতুষ্ট সঙ্গীকে অগ্রাধিকার দেওয়া

সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্য বা ধন-সম্পদের চেয়ে তার ইমান, তাকওয়া, দ্বীনদারিতা ও ক্যানায়াত (অল্পে তুষ্টি)-কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে মানুষের মনে দুনিয়ার মোহ নেই, সেই সংসারকে শান্তিময় করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন—

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

‘চারটি বিষয় দেখে নারীকে বিবাহ করা হয়— তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিতা। সুতরাং তুমি দ্বীনদার নারীকে বিয়ে করে সফলকাম হয়ে যাও, তা না হলে তোমার হাত ধূলিমলিন হবে।’ (বুখারি ৫০৯০, মুসলিম ১৪৬৬)

৪. জীবনসঙ্গীর অধিকার সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান অর্জন

দাম্পত্য জীবনে কলহ ও অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ একে অপরের শরয়ি অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা। বিয়ের আগেই স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে কুরআন-হাদিসে কার কী অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত। অধিকার খর্ব করা বা অনাচারের সুযোগ না রেখে দায়িত্ব পালনে সচেতন হওয়াই সুখী সংসারের চাবিকাঠি।

৫. পুরুষদের হালাল উপার্জন ও নারীদের গৃহস্থালী দক্ষতা

পুরুষের ক্ষেত্রে: বিয়ের পর স্ত্রীর সার্বিক খোরপোষ ও সামাজিক দায়িত্ব বহন করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব। তাই বিয়ের আগে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে। এখানে কোটি টাকার মালিক হওয়া শর্ত নয়; বরং জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম হালাল রোজগারই যথেষ্ট। যদি কেউ ন্যূনতম ব্যয় বহনেও অপারগ হন, তবে তাকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নারীর ক্ষেত্রে: বিয়ের আগে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় কাজগুলো ভালোভাবে শেখা উচিত। অনেক সময় গৃহস্থালী বিদ্যায় দক্ষতার অভাবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সংসারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

৬. তালাকের স্পর্শকাতর মাসআলা-মাসাইল জেনে নেওয়া

অত্যন্ত জরুরি একটি প্রস্তুতি হলো বিয়ের আগেই তালাক সংক্রান্ত শরয়ি মাসআলা শিখে নেওয়া। রাগ বা ক্ষোভের বশে হুট করে শব্দ ব্যবহারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ, কোন পদ্ধতিতে তালাক দেওয়া বৈধ আর কোনটা ঘোর নাজায়েজ—তা জানা আবশ্যক। না জেনে আবেগের বশে তালাক দিয়ে পরবর্তীতে বহু পরিবারকে কঠিন অনুশোচনা ও অশান্তিতে পুড়তে দেখা যায়।

আরও পড়ুন
৭. পারিবারিক পর্দা ও সামাজিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞান

বিয়ের পর নতুন আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমানা জেনে রাখা অপরিহার্য—

  • একজন পুরুষ তার শ্বশুরবাড়ির কোন কোন কোন নারীদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন এবং কার কার সঙ্গে পর্দা করতে হবে।
  • একজন নারী তার স্বামীর বাড়ির কোন পুরুষদের (যেমন: ভাসুর, দেবর ইত্যাদি) সামনে যাবেন না এবং কার কার সঙ্গে পর্দা বজায় রাখবেন।
  • স্বামীর পরিবার ও মা-বাবার প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব এবং স্ত্রীর আত্মমর্যাদা রক্ষা ও পরিচর্যায় স্বামীর ভূমিকা কতটুকু।

এই সামাজিক ও শরয়ি ব্যবস্থাপনা আগে থেকে জানা থাকলে পরিবারে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অশালীন পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

বিয়ে কেবল দুটি মানুষের শারীরিক বা সামাজিক মেলবন্ধন নয়, এটি একটি নতুন পরিবার ও আদর্শ প্রজন্ম গড়ার দীর্ঘ পথচলা। হুট করে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এই পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার চেয়ে নিজেকে দ্বীনদারি, হালাল উপার্জন, নৈতিকতা ও শরিয়তের মাসআলা-মাসাইলে পরিপক্ক করে গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই ৭টি নববি প্রস্তুতি যদি প্রতিটি বিবাহইচ্ছুক তরুণ-তরুণী গ্রহণ করেন, তবে তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত সংসারেই অনাবিল শান্তি এনে দেবে না, বরং একটি আদর্শ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনেও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহসম্মত প্রস্তুতি নিয়ে বরকতময় দাম্পত্য জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার