বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের অবস্থান সর্বাগ্রে। তাদের সান্নিধ্য, ভালোবাসা ও ত্যাগের কোনো বিকল্প হয় না। ইসলাম তাদের প্রতি সদাচরণ ও সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। তবে মানুষ হিসেবে বাবা-মাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। কখনো ধর্মীয় বিষয়ে শিথিলতা, কখনো কারও প্রতি অন্যায় কিংবা পারিবারিক কোনো বিষয়ে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া—এমন ভুল তাদের দ্বারাও হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সন্তান হিসেবে চুপ থাকা নাকি তাদের ভুল শুধরে দেওয়া সঠিক? ইসলাম আমাদের শেখায়— শ্রদ্ধার পরম মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত প্রজ্ঞা, নম্রতা ও ভালোবাসার সঙ্গে পিতামাতাকে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়াই একজন আদর্শ সন্তানের কাজ।
বাবা-মায়ের ভুল সংশোধনে ইসলামি মূলনীতি
পিতামাতার কোনো ত্রুটি চোখে পড়লে কীভাবে তা সংশোধন করতে হবে, সে বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ সুস্পষ্ট ও নিখুঁত—
১. সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে কথা বলা
পিতামাতা ভুল করলেও তাদের প্রতি কোনো কটু কথা বলা, রাগ দেখানো বা অপমান করা যাবে না। কথা বলার সময়েও কণ্ঠস্বর যেন নিচু ও মার্জিত থাকে।
২. হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
পিতা আজর মূর্তিপূজায় লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও হজরত ইবরাহিম (আ.) তাকে অত্যন্ত নমনীয়ভাবে আহ্বান করেছিলেন। তিনি পিতাকে ‘হে আমার প্রিয় পিতা’ বলে সম্বোধন করেন। এমনকি পিতা তাকে হুমকি দিলেও ইবরাহিম (আ.) শান্ত থেকে তার জন্য দোয়া ও শান্তির বার্তা পৌঁছে দেন। এটি আমাদের শেখায়—সত্যের পথে ডাকার সময়ও ভাষার সৌন্দর্য ও শ্রদ্ধা ধরে রাখতে হয়।
৩. ভুল ধরিয়ে দেওয়ার প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি
- তথ্য ও দলিল নিশ্চিত হওয়া: কোনো বিষয় নিজের অপছন্দ হলেই তা ভুল নয়। নিশ্চিত হতে হবে বিষয়টি আসলেই শরিয়ত বা যুক্তির নিরিখে অন্যায় কি না। মতভেদপূর্ণ বিষয়ে নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
- একান্তে ও নরম সুরে কথা বলা: সবার সামনে অপমান না করে নীরব পরিবেশে একান্তে নরম ভাষায় বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে।
- বিনম্র পরামর্শের শৈলী: ‘আপনি সব সময় ভুল করেন’— এমন না বলে ‘আমি বিষয়টির বিধান এভাবে দেখেছি, আপনি কি একটু ভেবে দেখবেন?’— এভাবে বলা ভালো।
- নিজের উত্তম আচরণ: সন্তান নিজে সৎ ও বিনয়ী না হলে তার ভালো কথার প্রভাব বাবা-মায়ের ওপর পড়ে না।
অন্যায় নির্দেশ ও সন্তানের দায়িত্বের সীমানা
- গুনাহের কাজে অমান্য কিন্তু সদাচরণ বজায় রাখা: পিতামাতা যদি কোনো অন্যায় বা গুনাহের নির্দেশ দেন (যেমন—মিথ্যা সাক্ষ্য, জুলুম বা অন্যের হক নষ্ট), তবে সেই নির্দেশ মানা যাবে না। তবে এই অমান্যের ক্ষেত্রেও কঠোর বা অভদ্র আচরণ করা হারাম।
- হেদায়েতের মালিক আল্লাহ: সন্তান হিসেবে চেষ্টা করা, বোঝানো এবং দোয়া করাই দায়িত্ব। কাউকে হেদায়েত দেওয়া সন্তানের হাতে নেই।
- অন্যায় প্রতিরোধে প্রজ্ঞা: অন্যায় দেখলে তা সাধ্যমতো প্রতিরোধের নির্দেশ থাকলেও বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে কোনো জোরজবরদস্তি করা যাবে না। এতে যদি পারিবারিক কলহ বা আরও বড় অনার্থের আশঙ্কা থাকে, তবে নরম উপায়ে বা অভিজ্ঞ কারও মাধ্যমে বোঝানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
জটিল পরিস্থিতিতে ও বারবার ব্যর্থ হলে করণীয়
- বিরতি দিয়ে চেষ্টা করা: বারবার একই কথা না বলে উপযুক্ত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করা ভালো।
- তৃতীয় পক্ষের সহায়তা: পরিবারে এমন কোনো প্রবীণ বা গুণী ব্যক্তি কিংবা আলেম থাকলে, যাঁকে পিতামাতা মান্য করেন, তাঁর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা যায়।
- পারিবারিক বিরোধে ন্যায়বিচার: স্ত্রী ও বাবা-মায়ের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে কারও ওপর অন্যায় না করে ন্যায়পরায়ণ থাকতে হবে।
- কখনো নীরব থাকা সমাধান নয়: গুরুতর কোনো নিপীড়ন, নির্যাতন বা অন্যের বড় ক্ষতির বিষয় থাকলে উপযুক্ত অভিভাবক বা আইনি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
- গুনাহের দায় ব্যক্তির নিজের: পিতামাতার ভুল বা গুনাহের দায়ভার সন্তানের ওপর চাপবে না। তবে পরিবারের সুন্দর পরিবেশের জন্য সন্তানের চেষ্টা ও দোয়া অব্যাহত রাখা দরকার।
হেদায়েতের আলোয় কুরআন ও হাদিসের দিকনির্দেশনা
১. পিতামাতার সাথে সম্মানের আদেশ
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ২৩)
২. হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বিনম্র সম্বোধন
বাবাকে ভুল বোঝানোর ক্ষেত্রে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর আচরণ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাঁর বাবা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলেন। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে সেই ভুল থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সম্বোধনে সম্মান বজায় রেখেছেন। কুরআনে তার কথাটি এভাবে ওঠে এসেছে—
اِذۡ قَالَ لِاَبِیۡهِ یٰۤاَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا یَسۡمَعُ وَ لَا یُبۡصِرُ وَ لَا یُغۡنِیۡ عَنۡكَ شَیۡئًا
‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! আপনি তার ইবাদাত করেন কেন যে শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোন কাজেই আসে না?’ (সুরা মারইয়াম: আয়াত ৪২)
ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
বাবা-মাকে কিছু বলার আগে নিশ্চিত হতে হবে, বিষয়টি সত্যিই অন্যায় কি না। কোনো সিদ্ধান্ত নিজের অপছন্দের হলেই সেটি অন্যায় হয়ে যায় না। ধর্মীয় বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহর দলিল যাচাই করা জরুরি। আলেমদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মতভেদ থাকলে নিজের পছন্দের মতটিকে একমাত্র সঠিক বলে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শোনা কথা বা কুধারণার ভিত্তিতেও কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না।
বাবা-মা গুনাহের কাজে নির্দেশ দিলে তা পালন করা যাবে না। তবে তাঁদের নির্দেশ অমান্য করার সময়ও সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ اِنۡ جَاهَدٰكَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِكَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَكَ بِهٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡهُمَا وَ صَاحِبۡهُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا ۫ وَّ اتَّبِعۡ سَبِیۡلَ مَنۡ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرۡجِعُكُمۡ فَاُنَبِّئُكُمۡ بِمَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৫)
বোঝানোর পরও কাজ না হলে কী করবেন?
বারবার বোঝানোর পরও বাবা-মা ভুল থেকে ফিরে না এলে একই কথা যখন তখন বলে বিরক্তি তৈরি না করে কিছুদিন বিরতি দেওয়া যেতে পারে। পরে সুযোগ বুঝে শান্ত পরিবেশে আবার নম্রভাবে কথা বলুন। পরিবারের এমন কোনো বিচক্ষণ আত্মীয় বা বিশ্বস্ত আলেমের সাহায্য নিন, যার কথা তারা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। তাদের হেদায়াতের জন্য দোয়া করুন এবং সেবা ও সদাচরণ বজায় রাখুন।
বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?
না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা ফাতির: ১৮) প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করবে। তবে বাবা-মায়ের আচরণের কারণে সন্তানের জীবনে পারিবারিক ও মানসিক প্রভাব পড়তে পারে। তাই নিজের আমল ঠিক রাখার পাশাপাশি সম্ভব হলে পরিবারে ভালো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা উচিত।