Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

নবীজির বিনয় থেকে উম্মতের শিক্ষা

Icon

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

নবীজির বিনয় থেকে উম্মতের শিক্ষা

বিজ্ঞাপন

চারিত্রিক বিশেষ গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো বিনয়। বিনয় হলো বন্দেগি ও দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। এ দাসত্বের গুণ যে যত বেশি অর্জন করতে পারে, সে নিজেকে ততটাই মহান প্রভুর সামনে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হিসাবে পেশ করতে পারে। এমন খাঁটি বান্দা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, আমার যা কৃতিত্ব, এর কোনোটাই আমার নয়। এসব কিছু আমার প্রতি মহান আল্লাহ তা‘য়ালার দয়া ও দান। আমার যা কিছু অর্জন, এর কিছুই আমার উপার্জন নয়, বরং সবই রব্বে কারীমের করুণা ও অনুগ্রহ। দুনিয়াতে প্রাপ্ত সবকিছু যখন আল্লাহ তা’য়ালার দান হিসাবে কেউ মেনে নেয়, তখন অনিবার্যভাবে সে হয়ে উঠে কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী। বিনয়ী ব্যক্তি নিজের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে থাকে। বান্দা হিসাবে সে আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য লাভ করে। বিনীত লোকদের পরিচয় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে কুরআনে কারীমের মাঝে। ইরশাদ হচ্ছে,

وبشرالمخبتين الذين اذا ذكروا الله وجلت قلوبهم والصابرين على ما أصابهم والمقيمي الصلاة ومما رزقناهم ينفقون

আর (হে নবী) সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। যাদের সামনে আল্লাহকে স্বরণ করা হলে তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত হয়, যে কোনো বিপদে আক্রান্ত হলে ধৈর্যশীল থাকে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। (সুরা হজ: ৩৪-৩৫)

এখানে আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি বিনীত ও আত্মনিবেদিতদের চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে।

এক. যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত হয়। অর্থাৎ তখন তারা অবনত মস্তকে আল্লাহর হুকুম গ্রহণ করে নেয় এবং আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের গুনাহের কাজ ছেড়ে দেয়।

দুই. যে কোনো বিপদ-আপদে আক্রান্ত হলে ধৈর্যশীল থাকে। অর্থাৎ দুঃখ-কষ্ট দেখা দিলে, আল্লাহকে স্মরণ করে। অসন্তোষ প্রকাশ করে না। সর্বদা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে।

তিন. যারা সালাত কায়েম করে। অর্থাৎ সালাতের যাবতীয় বিধি-বিধান ও আদবের প্রতি মনোযোগী হয়ে পূর্ণ খুশু ও খুজুর সাথে সময়মতো সর্বদা সালাত আদায় করে।

চার. আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে আল্লাহর পথে। অর্থাৎ সম্পদের হক আদায় করে দুঃস্থ অভাবীদের জন্য খরচ করে। সম্পদ থেকে ফরজ প্রাপ্য আদায় করে এবং নফল দানও করে।

এমন গুণের অধিকারী বিনীতদের প্রশংসা আল্লাহ তা’আলা নিজেই করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-

فإلاهكم إلاه واحد فله أسلموا وبشر المخبتين

তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ। সুতরাং তোমরা তাঁরই আনুগত্য করবে। আর (হে নবী) সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। (সুরা হজ:৩৪)

সুরা হুদের এক আয়াতে বিনীতদের জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-

إن الذين آمنوا و عملوا الصالحات و أخبتوا إلى ربهم أولئك أصحاب الجنة هم فيها خالدون.ـ

যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে এবং নিজ প্রতিপালকের সামনে বিনীত প্রশান্ত হয়ে গেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা তাতে চিরকাল থাকবে। (সুরা হুদ: ২৩)

কুরআন কারিমে আল্লাহ তা’য়ালার তাঁর প্রিয় হাবীবকে বিনয় ও নম্রতার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন,

(واخفض جناحك لمن اتبعك من المؤمنين)

অর্থাৎ: আর যে মুমিনগণ তোমার অনুসরণ করে, তাদের জন্য বিনয়ের সাথে মমতার ডানা নুইয়ে দাও। (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ২১৫)

বিনয়ী হওয়ার ব্যাপারে হাদিসে অনেক তাগিদ এসেছে।

হযরত ইয়াজ ইবনে হিমার (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إن الله أوحى إلي أن تواضعوا حتى لا يبغي أحد على أحد ولا يفخر أحد على أحد .

অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তা‘য়ালা আমাকে প্রত্যাদেশ করে বলেছেন: তোমরা বিনয়াবত হও। এমনভাবে যে, কেউ কারো উপর যেন জুলুম না করে এবং কেউ কারো সাথে যেন গর্ব না করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস:২৮৬৫)।

বিনয়ী ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যখন বিনয়াবত হয়, তখন তাকে আল্লাহ তা‘য়ালা ভালোবাসেন। দুনিয়া ও আখেরাতের সকল ক্ষেত্রে মর্যাদাবান করেন। মানুষের চোখে তার একটা অবস্থান তৈরী হয়। সবাই তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। সে হয়ে উঠে সবার মাঝে অনন্য। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

( أحد لله إلا رفعه الله وما تواضع...)

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কোনো ব্যক্তি বিনয়াবত হলে আল্লাহ অবশ্যই তার মর্যাদা উঁচু করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম:১১/৩০৬)

বিনয়ী ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেলে আল্লাহ তা‘য়ালা বাস্তবায়ন করেন,

সর্বোপরি এই গুণের অধিকারী হওয়ার কারণে আল্লাহর এত নৈকট্য অর্জন হয় যে, সে যদি আল্লাহর নামে কসম করে বলে, অমুক বিষয়টি হবে, তাহলে তা হবে; আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করে দিবেন।

হযরত হারেসা ইবনে ওহাব (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ألا أخبركم بأهل الجنة؟! كل ضعيف مضعف, لو أقسم على الله لأبره ألا أخبركم بأهل النار كل عتل جواظ مستكبر

অর্থাৎ, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোক সম্পর্কে অবগত করবো না? তারা ঐ সমস্ত লোক, যারা দুর্বল। যাদের চাল-চলন ও উঠা-বসা কোমল হওয়ার কারণে মানুষ তাদেরকে দুর্বল মনে করে (কিন্তু আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হল এমন যে,) যদি আল্লাহর নামে সে শপথ করে, আল্লাহ তা‘য়ালা তা পূর্ণ করেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামি লোক সম্পর্কে অবগত করবো না ? প্রত্যেক অহংকারী, রূঢ়, ধোঁকাবাজ ব্যক্তি হল জাহান্নামী। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯১৮ সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৫৩)

হাদিসে যে দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে -এটা অনাহারের কারণে দুর্বলতা নয়। অনাহারের কারণে দুর্বলতা প্রশংসনীয় বিষয় নয়। বরং উদ্দেশ্য হল এমন ভদ্র স্বভাবের যে, চাল-চলন ও উঠা-বসার ক্ষেত্রে অন্যদের সামনে নিজেকে গুটিয়ে রাখে এবং অন্যকে প্রাধান্য ও ছাড় দেয়। কারো সাথে ধোঁকাবাজি করে না। তার মাঝে ফুটে উঠে কোমলতা ও সরলতা। (মাআরিফুল হাদিস, ২/১৮)

আয়াতে উল্লেখিত বিনয় ও নম্রতার সর্বোত্তম পরাকাষ্ঠা স্থাপন করেছেন একমাত্র সৃষ্টির সেরা মানব প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ তা‘য়ালার প্রতি বিনীত ও আত্মনিবেদিত হওয়া এবং আল্লাহর সম্মুখে সর্বদা অবনত থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অর্জন করতে পেরেছিলেন দাসত্ব ও বন্দেগীর পূর্ণ মাত্রা। যার ন্যূনতম অংশ গ্রিক, ইরানি কিংবা ইউরোপীয় দর্শনের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তাঁর বিনয়ের উজ্জ্বল কিছু দিক পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি।

এক. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেকে আল্লাহ তা‘য়ালার গোলাম মনে করতেন,

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা‘য়ালার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হিসাবে সর্বোচ্চ প্রশংসা পাওয়ার উপযোগী। অথচ উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন তাঁর নামে অতিমাত্রায় না প্রশংসা করতে। আর নিজেকে গোলাম বলে পরিচয় দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত ওমর (রাযি:) কে মিম্বারের উপর খুৎবা দেয়ার সময় বলতে শুনেছেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,

لاتطروني كما أطرت النصارى ابن مريم فإنما أنا عبده فقولوا عبد الله و رسوله

খ্রিস্টানরা যেভাবে ঈসা (আ.) এর অতিমাত্রায় প্রশংসা করে, সেভাবে আমার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করো না। কারণ আমি আল্লাহর বান্দা। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলো। (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং. ৩৪৪৫)। (সহিহ্ মুসলিম, হাদিস: ১৬৯১)

দুই. অত্যন্ত সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন-

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের সাথে যেভাবে মিশে যেতেন, তাতে অপরিচিত কেউ তাকে চিনতে পারতো না। হযরত শারীক ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. থেকে বর্ণিত যে, আনাস (রাযি;) কে বলতে শুনেছি- একবার আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে মসজিদে বসেছিলাম। তখন এক লোক উটের উপর আরোহন করে মসজিদে প্রবেশ করলো এবং উট বসিয়ে তা বাধলো। তারপর লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের পিছনে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তখন আমরা তাকে বললাম: হেলান দিয়ে বসে থাকা এই সুন্দর লোকটা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩)

তিন. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাদেরও সালাম দিতেন-

হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বললেন:

(كان النبي صلى الله على وسلم يفعله)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করতেন। (সহিহ বুখারি,হাদিস নং: ৬২৪৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৬৮)

বড়রা যেভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করে অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে বিনয় ও নম্রতা অর্জন করেছে ঠিক তদ্রূপ বাচ্চারাও এ থেকে ইসলামী শিষ্টাচারের শিক্ষা লাভ করে।

চার. পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন-

আমরা পরিবারের মানুষের কাছে বাহিরের পরিচয় প্রকাশ করতে থাকি। তাদেরকে সেবক বানিয়ে রাখি। অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন। ব্যক্তিগত কাজ নিজ হাতে করতেন।

হযরত আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ বলেন: আমি আয়েশা রাযি. কে প্রশ্ন করলাম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কী কাজ করতেন? উত্তরে বললেন:

(كان في مهنة أهله يعني خدمة أهله فإذا حضرت الصلاة خرج إلى الصلاة)

অর্থাৎ: তিনি পরিবারের খিদমতে নিয়োজিত থাকতেন। যখন নামাজের সময় হতো, নামাজ পড়তে মসজিদে যেতেন।

(সহিহ বুখারি হাদিস:৬০৩৯)

পাঁচ. গোলামের মত খাবার খেতেন-

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

أجلس كما يجلس العبد وآكل كما يأكل العبد

গোলাম যেভাবে বসে আমি সেভাবে বসি এবং গোলাম যেভাবে খায় আমি সেভাবে খাই। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩১২)

হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খাবার খেতেন তখন তিন আঙুল চেটে পরিষ্কার করে খেতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:

إذا سقطت لقمة أحدكم فليمط عنها الأذى وليأكلها ولا يدعها للشيطان)

অর্থাৎ, তোমাদের কারো লোকমা যদি পড়ে যায়, তাহলে ময়লা সরিয়ে তা যেন খেয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য রেখে না দেয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাত্র পরিষ্কার করে চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে আরো বলেন:

(فإنكم لا تدرون في أي طعامه البركة) অর্থাৎ: তোমাদের জানা নেই খাবারের কোন অংশের মধ্যে বরকত রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৩৪)

ছয়. বকরি চরাতেন-

যার অস্তিত্বের কারণে আমাদের অস্তিত্ব, সেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে খুব সাধারণভাবে জীবন কাটিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মত জীবিকা নির্বাহ করতেন। হাদিসের ভাষায় সেই চিত্র উঠে এসেছে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-

(ما بعث الله نبيا إلا رعى الغنم ,قال أصحابه:وأنت؟ فقال نعم! كنت أرعاهاعلى قراريط لأهل مكة)

অর্থাৎ:আল্লাহ যে নবীই প্রেরণ করেছেন তিনি বকরি চড়িয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন: হুজুর আপনিও? তিনি বললেন: আমি কেরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর বকরী চড়াতাম। (সহিহ বুখারী,হাদিস নং:২২৬২)

সাত: অসহায় ও নিম্নশ্রেণীর লোকজন নিঃসংকোচে তাঁর কাছে মনের কথা বলতে পারতো-

এমন মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম অসহায় ও নিম্নশ্রেণীর লোকদেরকে মূল্যায়ন করতেন। তাদের কাছে আপনজনের চেয়েও প্রিয় ছিলেন।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন: মদিনার কোন দাসী নবীজির হাত ধরে যে দিকে ইচ্ছা সে দিকে নিয়ে যেতে পারতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৭২)

হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক লোক আসে কথা বলতে লাগলো। তখন ভয়ে তার ঘাড়ের রগ কাঁপতে লাগলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম তাকে বললেন-

‏” هَوِّنْ عَلَيْكَ فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكٍ إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ.‏.

‏ তুমি শান্ত হও, স্বাভাবিক হও। কারণ আমি কোন রাজা-বাদশা নই, বরং আমি শুকনো মাংস খেয়ে জীবনধারিণী এক মহিলার পুত্র। (সুনানে ইবনে মাজাহ,হাদিস নং:৩৩১২) قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ إِسْمَاعِيلُ وَحْدَهُ وَصَلَهُ ‏.‏

আট. উম্মতের প্রতি দরদি ছিলেন-

নবীজি উম্মতের ফিকিরে বিভোর ছিলেন। উম্মতের জরুরি প্রয়োজনকে নিজের কাজের উপর প্রাধান্য দিতেন।

হযরত আবু রিফায়াহ তামিম বিন উসাইদ (রাযি:)বলেন: আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা দিচ্ছিলেন।

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! অপরিচিত ভীনদেশী এক লোক এসেছে আপনার কাছে, দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তার জানা নেই যে, দ্বীনের কী কী বিষয় রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার প্রতি মনোযোগী হলেন। খুৎবা ছেড়ে আমার কাছে আসলেন। চেয়ার আনা হল। তাতে বসে আমাকে শিখাতে লাগলেন, আল্লাহ তাকে যা শিখিয়েছেন। অতঃপর আবার খুৎবা দিয়ে তা পূর্ণ করলেন। (সহিহ মুসলিম,হাদিস নং৫৩৭৭)

নয়. বিজয়ী সেনানায়কের ক্ষমতা দাপট ছেড়ে বিনয়-নম্রতা গ্রহণ করেছেন-

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের নির্যাতনের কারণে মাতৃভূমি ত্যাগ করে মক্কায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে একদিন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। সেদিন মক্কার আকাশে উড়ে ছিল ইসলামের পতাকা। কাফেররা বিষণ্ন চোখে দেখছিল মুসলমানদের প্রবেশযাত্রা। তখন শুধু সাহাবায়ে কেরামের জন্য ছিল আনন্দ আর আনন্দ। তবে এই মহাবিজয়ের দিনেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বিনয়ী। তার চেহারায় ছিল না কোন অহংকারের ছাপ। বিজয়ী সেনাদের প্রতাপ কিংবা ক্ষমতার দাপট। বরং এতটাই বিনয় প্রকাশ পাচ্ছিল যে, যার বর্ণনা হাদিসে এভাবে এসেছে, হযরত আনাস (রাযি:)বর্ণিত যে, তিনি বলেন: মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করলেন। তখন মাথা এতটা নিচু করে রেখে ছিলেন বাহন জন্তুর সাথে স্পর্শ করতো। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ, (খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৪২)

দয়াময় আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হতে হলে জীবনের সর্বক্ষেত্র তথা: ইবাদত বন্দেগী থেকে শুরু করে ঘরে বাইরে সর্বত্র বিনয়ের অনুশীলন করতে হবে। বিনীতদের গুণাবলী অর্জনের জন্য চেষ্টা—সাধনা করতে হবে। সে চেষ্টা ও অনুশীলনের একটা দিক হল, তা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমের সুন্নাহ ও সীরাতুন্নবী থেকে পাঠ গ্রহণ করি। সে চেষ্টা ও অনুশীলনের আরেকটি দিক হল অনুনয়—বিনয় করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেন:

رب اجعلني لك شكارا لك ذكارا لك رهابا لك مطواعا لك مخبتا اليك اواها منيبا

হে আল্লাহ! আমাকে করুন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ, আপনাকে সর্বদা স্মরণকারী, আপনার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত, আপনার প্রতি পূর্ণ অনুগত, প্রশান্তির সাথে আপনার প্রতি বিনয়াবত এবং আপনার নিকট আহাজারীকারী ও প্রত্যাবর্তনকারী। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৫১; সুনান আবু দাউদ হাদিস: ৩৮৩০)

এই দোয়াটি আমরা নিজেদের দোয়া মোনাজাতে শামিল করে নিতে পারি আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার