বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আমাদের সমাজে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা এক ভিন্ন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ের মতো এ বিষয়েও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ও মর্যাদা ইসলাম সংরক্ষণ করেছে। হিজড়াদের ইমামতি এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের পরিচয় ও বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।
হিজড়াদের ইমামতি ও নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শরিয়তি বিধান
নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে ইমামের যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। হিজড়াদের ইমামতির বিষয়টি মূলত তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল—
- পুরুষ বৈশিষ্ট্য প্রবল হিজড়া: যে হিজড়ার মধ্যে পুরুষের বৈশিষ্ট্য প্রবল থাকে, শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি পুরুষ গণ্য হন। তাই ইমামতির অন্যান্য সাধারণ যোগ্যতা থাকলে তার ইমামতি জায়েজ। তার পেছনে পুরুষ ও নারী উভয়েরই নামাজ সম্পূর্ণ শুদ্ধ হবে।
- নারী বৈশিষ্ট্য প্রবল বা জটিল হিজড়া: যে হিজড়া ব্যক্তির মধ্যে নারীর বৈশিষ্ট্য প্রবল অথবা নারী-পুরুষ উভয় বৈশিষ্ট্য সমান (যাদেরকে ‘খুনসায়ে মুশকিলা’ বা জটিল হিজড়া বলা হয়), অন্যান্য নারীর মতোই তিনি পুরুষদের জামাতের ইমাম হতে পারবেন না। তার ইমামতিতে পুরুষ বা পুরুষ বৈশিষ্ট্য প্রবল এমন হিজড়াদের নামাজ শুদ্ধ হবে না। তবে তিনি যদি নারী ও নারী বৈশিষ্ট্য প্রবল এমন হিজড়াদের ইমামতি করেন, তবে তাদের নামাজ শুদ্ধ হবে।
ইসলামে হিজড়ার প্রকারভেদ ও শরিয়তি বিধান
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে হিজড়াদের মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—
১. পুরুষ হিজড়া
যেসব হিজড়ার মধ্যে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য প্রবল থাকে, শরিয়তে তাদের পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়।
লক্ষণ: দাড়ি-গোঁফ গজানো, নারী সহবাসে সক্ষমতা, স্বপ্নদোষ হওয়া ইত্যাদি।
বিধান: পুরুষের যাবতীয় বিধিবিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন—ইমামতি শুদ্ধ হওয়া, নারীর সঙ্গে বিবাহ বৈধ হওয়া, পুরুষের সঙ্গে বিবাহ অবৈধ হওয়া, নারীর সঙ্গে পর্দা জরুরি হওয়া এবং মীরাসের (উত্তরাধিকার) সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে পুরুষ বিবেচনা করে অংশ নির্ধারণ করা।
২. নারী হিজড়া
যেসব হিজড়ার মধ্যে নারীর বৈশিষ্ট্য প্রবল থাকে, তাদের নারী গণ্য করা হয়।
লক্ষণ: স্তন বিকশিত হওয়া, ঋতুস্রাব হওয়া, সহবাসের উপযোগিতা থাকা, গর্ভ সঞ্চার হওয়ার ক্ষমতা থাকা ইত্যাদি।
বিধান: নারীদের যাবতীয় বিধিবিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন— পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বৈধ হওয়া, নারীর সঙ্গে বিবাহ অবৈধ হওয়া, পুরুষের সঙ্গে পর্দা করা এবং মীরাসের ক্ষেত্রে নারী বিবেচনা করে সম্পদ বণ্টন করা।
৩. জটিল হিজড়া (খুনসায়ে মুশকিলা)
যেসব হিজড়ার মধ্যে নারী-পুরুষের কোনো স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় না অথবা উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্য সমানভাবে থাকে, তাদের ‘খুনসায়ে মুশকিলা’ বা জটিল হিজড়া বলা হয়।
- নির্ধারণের পদ্ধতি: ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন চিহ্ন বা আলামতের ভিত্তিতে তাকে পুরুষ বা নারী শ্রেণিভুক্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।
- চিকিৎসা ও সতর্কতা: বিরল ক্ষেত্রে কোনো হিজড়াকে নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করা না গেলে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তায় নারী বা পুরুষের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়ার চেষ্টা করা তার জন্য জায়েজ। চিকিৎসা গ্রহণের পর শরীরে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাকে পুরুষ বা নারী বিবেচনা করা হবে।
- এর আগ পর্যন্ত পর্দা ও বিয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ পুরুষরা তাকে নারী এবং নারীরা তাকে পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করবে। উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষ হিসেবে যদি তার ভিন্ন ভিন্ন অংশ হয়, তবে তাকে তুলনামূলক কম সম্পত্তির অধিকারী লিঙ্গটি বিবেচনা করে সম্পত্তি প্রদান করতে হবে, যাতে অন্যের হক নষ্ট না হয়।
ইসলাম ধর্মে লিঙ্গ বা শারীরিক গঠনের ভিন্নতার কারণে কোনো মানুষকে তার জন্মগত মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
‘আর আমি তো আদমসন্তানকে সম্মান দিয়েছি এবং তাদের জলে-স্থলে বাহনে চড়িয়েছি এবং তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি। আর আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৭০)
মানবীয় মর্যাদার পাশাপাশি ইবাদত ও তাকওয়ার মাপকাঠিতেই আল্লাহর দরবারে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ علِيمٌ خَبِيرٌ
‘হে মানুষ! আমি তো তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাপন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশি মুত্তাকি (পরহেজগার)। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১৩)
হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও আমাদের সমাজেরই অংশ। শারীরিক কোনো ব্যতিক্রম বা জটিলতার কারণে ইসলাম তাদের মৌলিক মানবাধিকার, ইবাদত কিংবা সামাজিক সম্মান থেকে বঞ্চিত করেনি। শরিয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান মেনে তাদের সঠিক পরিচর্যা, অধিকার রক্ষা এবং ইবাদত পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব বিষয়ে শরিয়তের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।