বিজ্ঞাপন
মাথায় টুপি পরা নিয়ে ডা. জাকির নায়েকের বিশ্লেষণ
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
নামাজ আদায়ের সময় টুপি বা পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা ইসলামি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে গালফ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসকারী কিংবা হজ থেকে ফিরে আসা অনেককেই দেখা যায় ইচ্ছাকৃতভাবে টুপি পরিহার করে খালি মাথায় নামাজ আদায় করে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মনে নানা সংশয় ও দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
একজন মুসলিমের জীবনে টুপি বা মাথা ঢেকে রাখার গুরুত্ব ঠিক কতটুকু এবং খালি মাথায় নামাজ আদায় সম্পর্কে ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি কী— এক টিভি অনুষ্ঠানে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ডা. জাকির নায়েক। আসুন, জেনে নিই তার বিশ্লেষণ—
টুপি ও পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা কি সুন্নত?
ডা. জাকির নায়েক বলেন, অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা এটি সুপ্রমাণিত যে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মাথা সর্বদাই আবৃত থাকত। তিনি টুপি, পাগড়ি কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রের শিরস্ত্রাণ দিয়ে সর্বদা মাথা ঢেকে রাখতেন। কেবল নবীজি (সা.) নন, তার প্রিয় সাহাবিদের মাথার পোশাকও সর্বদাই আবৃত থাকত।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় আরবিতে টুপিকে ‘কুফি’ বলা হয়, যা আমাদের এই উপমহাদেশে ‘টুপি’ নামে বহুল পরিচিত। হাদিসের প্রমাণ অনুযায়ী—
- টুপি ও পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল।
- নামাজের ভেতরেও মাথা ঢেকে রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মুস্তাহাব।
- কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে খালি মাথায় নামাজ পড়া মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
চার মাজহাবের ইমামদের ঐক্যমত
ডা. জাকির নায়েক স্পষ্ট উল্লেখ করেন, মাথা ঢেকে রাখার বিষয়ে চার মাজহাবের সম্মানিত ইমামগণ— ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-সহ তৎকালীন ও পরবর্তী প্রায় সকল বুজুর্গ ও আলেম একমত হয়েছেন।
ইমাম মালিক (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইসলামের শুভসূচনা থেকে আজ পর্যন্ত আলেম, সাহাবি ও সালাফদের যুগপরম্পরায় সর্বত্র এই টুপি বা পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখার সুন্দর রীতি চলে আসছে।’
খালি মাথায় নামাজ আদায়ের পেছনের মানসিকতা ও ভুল যুক্তি
আগে ভারতীয় উপমহাদেশসহ সব দেশের মসজিদে প্রায় শতভাগ মানুষই টুপি পরে নামাজে দাঁড়াতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক জায়গায় দেখা যায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ খালি মাথায় নামাজ আদায় করছেন। এর মূল কারণ ও ভ্রান্ত যুক্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো—
১. অসম্পূর্ণ জ্ঞানের প্রকাশ
বিদেশে বা গালফ দেশগুলোতে গিয়ে অনেকে জানতে পারেন যে, ‘নামাজ কবুল হওয়ার জন্য টুপি পরা ফরজ নয়, টুপি ছাড়াও নামাজ হয়ে যায়।' এই প্রাথমিক ও অসম্পূর্ণ জ্ঞানটুকু পাওয়ার পর অনেকে নিজেদের জ্ঞান জাহির করতেই হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে টুপি পরা ছেড়ে দেন। অথচ টুপি পরা যে একটি ফজিলতপূর্ণ মুস্তাহাব ও সুন্নত কাজ, সে বিষয়টি তারা এড়িয়ে যান।
২. ইহরামের সাথে সাধারণ সময়ের ভুল তুলনা
অনেকে যুক্তি দেখান— হজের সময় ইহরাম অবস্থায় খালি মাথায় নামাজ পড়া হয়, তাই সাধারণ অবস্থাতেও টুপি ছাড়া নামাজ পড়া যাবে। ডা. জাকির নায়েক এই যুক্তিটিকে সম্পূর্ণ ভুল ও অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ—
- ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য মাথা ঢাকা হারাম বা নিষিদ্ধ।
- এটি ঠিক তেমনই, যেমন সাধারণ সময়ে নখ ও চুল কাটা সুন্নত বা মুস্তাহাব হলেও ইহরাম অবস্থায় তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- তাই ইহরামের বিশেষ বিধানের সঙ্গে সাধারণ সময়ের আমলকে মেলানো শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই সঠিক নয়।
নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের আমল: হাদিসের আলোকে প্রমাণ
টুপি ও পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢাকার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাদিসের উদ্ধৃতি নিচে প্রদান করা হলো—
১. মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি (সা.)-এর মাথার পোশাক
হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মক্কা বিজয়ের মহা আনন্দের দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাথার পোশাকের বর্ণনা এসেছে এভাবে—
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ مَكَّةَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ
‘নবী করিম (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন তার মাথায় একটি কালো রঙের পাগড়ি শোভা পাচ্ছিল।’ (মুসলিম ৩১৪৮)
২. নবীজি (সা.)-এর সাদা টুপি পরিধান
হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.)-এর টুপি ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে—
‘মহানবী (সা.) সাদা রঙের টুপি পরিধান করতেন।’ (তাবরানি)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পথ অনুসরণ করে তার প্রিয় সাহাবিগণও টুপি ব্যবহার করতেন। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর আমল সম্পর্কে সহিহ বুখারিতে এসেছে—
وَكُوفِيَّةٌ: وَكَانَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَلْبَسُ الْكُوفِيَّةَ
‘হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) টুপি (কুফি) দিয়ে নিজের মাথা ঢেকে রাখতেন।’ (বুখারি ৫৮০২)
গালফ অঞ্চলের বিশিষ্ট আলেমদের আমল
ডা. জাকির নায়েক স্মরণ করিয়ে দেন যে, আধুনিককালের বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আলবানি (রহ.) এবং সৌদি আরবের প্রখ্যাত গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ বিন বাজ (রহ.)-সহ গালফ অঞ্চলের সকল বড় বড় বরেণ্য আলেমরা সর্বদা টুপি বা রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতেন। মিসরের কিছু আলেমের শিথিল ফতোয়া কিংবা ভুল ব্যাখ্যার কারণে সাধারণ মানুষ আজ মহানবীর সুন্দর সুন্নত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
নামাজ হলো আল্লাহর দরবারে বান্দার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হাজিরা ও ইবাদত। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সময় পোশাকে শালীনতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখা ইমানের দাবি। টুপি পরা ফরজ না হলেও, এটিকে অবহেলা করে খালি মাথায় নামাজে দাঁড়ানো নবীজির সুন্নত ও সালাফদের ধারার পরিপন্থি। তাই কোনো বিভ্রান্তি বা যুক্তির পেছনে না ছুটে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসায় টুপি বা পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে নামাজ আদায় করাই একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই ছোট আমলটি সওয়াব অর্জনের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় নবীজির (সা.) সুন্নত জিন্দা করার এক মহান সুযোগ এনে দেয়।