বিজ্ঞাপন
‘প্রেমিক যুগলের বিয়ে সর্বোত্তম’ তবে কি বিবাহপূর্ব সম্পর্ক বৈধ?
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৩ এএম
বিজ্ঞাপন
মানব হৃদয়ে কারো প্রতি অনুরাগের সঞ্চার হওয়া এক অত্যন্ত প্রাকৃত ও স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু এই আবেগকে কেন্দ্র করে আধুনিক সমাজে বিবাহপূর্ব প্রেম ও অনৈতিক সম্পর্কের যে প্রচলন ঘটেছে, ইসলামি শরিয়ত তার সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। ভালোবাসাকে পবিত্র ও টেকসই রূপ দিতে ইসলাম বিয়ের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে। পরস্পরকে ভালোবাসে এমন দুজন মানুষের জন্য বিয়েই যে সর্বোত্তম সমাধান— তা যেমন হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে, তেমনই বিবাহের পূর্বে অনৈতিক ও নিষিদ্ধ সম্পর্ক গড়ে তোলা থেকেও কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
হাদিসের আলোয় ভালোবাসার সর্বোত্তম সমাধান
যদি কোনো পুরুষ ও নারীর মধ্যে অন্তরে পরস্পরের প্রতি ভালো লাগা বা আসক্তি তৈরি হয়, তবে কোনো অনৈতিক পথে না গিয়ে তাদের দ্রুত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই সর্বোত্তম পথ। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَمْ نَرَ لِلْمُتَحَابَّيْنِ مِثْلَ النَّكَاحِ
‘পরস্পরকে ভালোবাসে এমন দুইজন মানুষের জন্য বিবাহের চেয়ে উত্তম (সমাধান) আর কিছু দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ ১৮৪৭)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আল-মুনাভি (রহ.) ‘ফয়জুল কাদির’ গ্রন্থে এই হাদিসের আলোচনায় বলেছেন, যখন কোনো পুরুষ কোনো পরনারীর দিকে তাকায় এবং সেই নারী তার হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন তাকে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে করা তাদের পবিত্র ভালোবাসা ও মানসিক প্রশান্তিকে আরও বৃদ্ধি করে।
বিবাহপূর্ব অবৈধ সম্পর্ক ও অন্তরের অনুভূতির সীমারেখা
‘প্রেমিক যুগলের বিয়ে সর্বোত্তম’—এই কথাটির অর্থ কখনোই বিবাহপূর্ব অনৈতিক প্রেম, গোপন যোগাযোগ বা শারীরিক ও মানসিক অবাধ মেলামেশাকে বৈধতা দেওয়া নয়।
১. ব্যভিচার ও এর মাধ্যমসমূহ নিষিদ্ধ
ইসলাম ব্যভিচারকে চরম জঘন্য কাজ ঘোষণা করেছে এবং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন সব ধরনের দৃষ্টিপাত, শারীরিক স্পর্শ ও গোপন যোগাযোগকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই তা হচ্ছে এক চরম অশ্লীল কাজ এবং অতি জঘন্য পথ।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩২)
২. অনৈচ্ছিক অনুভূতির হুকুম
কোনো অবৈধ সম্পর্ক বা পাপের ইচ্ছা ছাড়া যদি অনৈচ্ছিকভাব (যেমন— এক নজর দেখার পর কিংবা কারো সৎ গুণের কথা শুনে) অন্তরে অনুরাগের জন্ম হয়, তবে তার জন্য বান্দা গুনাহগার হবে না। কিন্তু সেই অনুভূতির বশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রক্ষা করা সম্পূর্ণ হারাম।
বিয়ের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ৩ হাদিস
ইসলামে বিয়ের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা এবং ইমান পূর্ণতার জন্য বিবাহের গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে—
লজ্জাস্থান ও দৃষ্টির সুরক্ষায় বিবাহ
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বলেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য রয়েছে, সে যেন অবশ্যই বিয়ে করে। কারণ বিবাহ দৃষ্টিকে অধিক অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের নিরাপত্তা দেয়। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার যৌনচাহিদা দমন করবে (ঢালস্বরূপ)।’ (বুখারি ৫০৬৬, মুসলিম ১৪০০)
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي
‘বান্দা যখন বিয়ে করে, সে তার দ্বীনের (ঈমানের) অর্ধেক পূর্ণ করে ফেলে। অবশিষ্টাংশের জন্য তার উচিত আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অর্জন করা।’ (বাইহাকি ৫১০০)
পবিত্রতার উদ্দেশ্যে বিবাহে আল্লাহর বিশেষ সাহায্য
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ثَلاَثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ عَوْنُهُمْ: ... وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ
‘তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়— ১. চুক্তিভিত্তিক ক্রীতদাস যে মুক্তিপণ আদায় করতে চায়, ২. চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহকামী ব্যক্তি এবং ৩. আল্লাহর পথে জিহাদকারী।’ (তিরমিজি ১৬৫৫)
ইসলামে ভালোবাসার স্থান উঁচুতে, তবে তার পথ হতে হবে বৈধ ও পবিত্র। বিবাহপূর্ব প্রেম বা অবৈধ মেলামেশা কখনোই ইসলাম অনুমোদন করে না; বরং অন্তরে কারও প্রতি পছন্দ তৈরি হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহের পদক্ষেপ নেওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। বিয়ে কেবল শারীরিক বা মানসিক চাহিদাই মেটায় না, বরং চরিত্র হেফাজত করে ইমানকে পূর্ণতা দান করে।