Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

ইসলাম-পূর্ব যুগে কেমন ছিলেন ওমর (রা.)?

Icon

ইসলাম ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:০০ পিএম

ইসলাম-পূর্ব যুগে কেমন ছিলেন ওমর (রা.)?

বিজ্ঞাপন

আরবের আকাশ তখনও ওহির আলোয় উদ্ভাসিত হয়নি। মক্কার চারপাশে বিস্তৃত মরুপ্রান্তর, বাণিজ্যের কাফেলা, গোত্রের অহংকার, কবিদের গর্বগাথা আর শক্তির প্রতিযোগিতায় মুখর ছিল সমগ্র হিজাজ। মানুষ তখন বংশের পরিচয়ে বড়, তরবারির জোরে সম্মানিত, আর কাব্যের উচ্চারণে অমর হতে চাইত। সেই অন্ধকার সময়েই বেড়ে উঠছিলেন এক অসাধারণ যুবক। খাত্তাবের পুত্র ওমর। যিনি তখনও ইসলামের আলো স্পর্শ করেননি; বরং ছিলেন জাহিলিয়াতের সমাজে শক্তি, ব্যক্তিত্ব ও সাহসের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

ইতিহাসের বিস্ময় এখানেই। যে মানুষটি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কঠোরতা, দৃঢ়তা ও গোত্রীয় অহংকারের জন্য পরিচিত ছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ শাসক। কিন্তু সেই মহিমান্বিত অধ্যায়ের পূর্বে রয়েছে তার জীবনের আরেকটি দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব; মরুর ধুলো, উটের পাল, কুস্তির আখড়া, ঘোড়দৌড়ের মাঠ, ব্যবসায়িক সফর এবং কঠোর পিতার ছায়ায় গড়ে ওঠা এক যুবকের গল্প।

ইসলাম-পূর্ব ‍যুগের ওমরের দুটি ঘটনা

বিশ্বনবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুয়ত লাভের কয়েক বছর পূর্বে আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি ছিল ওকাজের মেলা। হজের পূর্ববর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত এই বার্ষিক মেলায় সমবেত হতো আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত অসংখ্য মানুষ। হিজাজ, শাম, ইয়েমেন বিভিন্ন ভূখণ্ডের ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য নিয়ে আসত। তাঁবুর পর তাঁবু গড়ে উঠত মরুর বুকজুড়ে। কোথাও সুগন্ধি, কোথাও রেশম, কোথাও অস্ত্র, কোথাও উট ও ঘোড়ার কেনাবেচা; আবার কোথাও বসত কবিতার আসর।

ওকাজ কেবল বাজার ছিল না; এটি ছিল আরবের সাংস্কৃতিক সংসদও। এখানে কবিরা নিজেদের গোত্রের বীরত্ব গাইতেন, বংশের মহিমা প্রচার করতেন এবং ভাষার সৌন্দর্যে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। একই সঙ্গে শক্তিরও ছিল আলাদা প্রদর্শনী। কুস্তিগীরদের আখড়ায় প্রতিটি গোত্রের শ্রেষ্ঠ যুবকেরা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণে অবতীর্ণ হতো।

এই মেলারই একদিনের ঘটনা।

একজন নামকরা কবি উচ্চকণ্ঠে গেয়ে চলেছেন নিজের গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব। তার কণ্ঠে উঠে আসছে এক বিখ্যাত কুস্তিগীরের অপরাজেয় শক্তির গল্প। দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে। বাহবার শব্দে আখড়া মুখর।

এক পর্যায়ে এক কোণে বসে থাকা দীর্ঘদেহী এক যুবক উঠে দাঁড়ালেন।

তার চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে কঠোর দৃঢ়তা। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন আখড়ার দিকে এবং সকলের সামনে কবির প্রশংসিত কুস্তিগীরকে শক্তি পরীক্ষার আহ্বান জানালেন।

মুহূর্তেই জনতার মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। এ যে খাত্তাবের ছেলে ওমর!

নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কৌতূহল বহুগুণ বেড়ে গেল। যে যেখানে ছিল, ছুটে এসে ভিড় করল আখড়ার চারপাশে। মরুর বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল। সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ দুই যুবকের ওপর।

প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রথম আক্রমণের সুযোগ দিলেন ওমর। বেদুইন যুবক বুক ফুলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার দিকে। কিন্তু ওমর স্থির। আক্রমণ প্রতিহত করে মুহূর্তের মধ্যে কৌশলে প্রতিপক্ষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন। তারপর এক শক্তিশালী আঘাতে তাকে মাটিতে ফেলে বুকের ওপর বসে পড়লেন পাহাড়ের মতো অনড় হয়ে।

প্রতিপক্ষ আর লড়তে পারল না।

প্রাণভিক্ষা চাইতেই ওমর তাকে ছেড়ে দিলেন। বিজয়ের উল্লাসে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। কিন্তু এই ঘটনায় কেবল তার শক্তির পরিচয়ই প্রকাশ পেল না; প্রকাশ পেল আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে আঘাত না করার মানসিকতা।

যদিও তখনও তার হৃদয় ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়নি, তবুও তার ব্যক্তিত্বের ভিত যে কত শক্ত ছিল, তার আভাস যেন এই ঘটনাতেই পাওয়া যায়।

ওকাজের মেলার আরেকটি আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড়। আরবদের কাছে ঘোড়া ছিল মর্যাদা, বীরত্ব ও সৌন্দর্যের প্রতীক। প্রত্যেক গোত্রের সেরা অশ্বারোহীরা নিজেদের দ্রুতগামী তাজি ঘোড়া নিয়ে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হতো।

সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন ওমরও।

তার কালো রঙের তাজি ঘোড়াটি ছিল সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। শক্তিশালী দেহ, দ্রুত পদক্ষেপ এবং প্রশিক্ষিত স্বভাবের জন্য ঘোড়াটি দূর থেকেই আলাদা করে নজর কাড়ছিল।

সংকেত দেওয়া মাত্রই শত শত খুরের শব্দে কেঁপে উঠল মরুভূমি। ধুলোর মেঘ উড়িয়ে প্রতিযোগীরা ছুটে চলল বায়ুর গতিতে। দর্শকেরা দূর থেকে অশ্বারোহীদের বিন্দুর মতো দেখতে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠল, একটি কালো ঘোড়া সবগুলো ঘোড়াকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

তার পিঠে বসে আছেন ওমর ইবনুল খাত্তাব।

তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের বহু দূরে ফেলে বিজয়ের শিরোপা অর্জন করলেন। আবারও জনতা জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল। কুস্তির আখড়ার মতো এবারও শক্তি ও দক্ষতার মেলবন্ধনে ওমর নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন।

তখন কেউ কি কল্পনা করতে পেরেছিল, এই অশ্বারোহী যুবক একদিন পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি বিস্তৃত এক সাম্রাজ্যের শাসক হবেন? কিংবা তার নাম উচ্চারিত হবে ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ উদাহরণ হিসেবে?

ওমরের পরিবার, বংশ ও বেড়ে ওঠা

ওমর ইবনুল খাত্তাবের জন্মসাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনার আলোকে সাধারণভাবে তাকে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চেয়ে প্রায় বারো বছরের ছোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে নেতৃত্ব, বিচারবুদ্ধি এবং বীরত্ব ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য।

তার পিতা ছিলেন খাত্তাব ইবনে নুফায়েল। কঠোর স্বভাবের, দৃঢ়চেতা এবং গোত্রে সম্মানিত ব্যক্তি। আর পিতামহ নুফায়েল ইবনু আবদুল উজ্জা ছিলেন কোরায়েশদের বিখ্যাত বিচারক। বংশপরিচয় নির্ধারণ, গোত্রগত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সূক্ষ্ম বিচারবোধের জন্য তার খ্যাতি সমগ্র মক্কায় ছড়িয়ে ছিল।

আরব সমাজে বংশের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মানুষের পরিচয় কেবল ব্যক্তিগত গুণে নয়, তার পূর্বপুরুষের মর্যাদাতেও নির্ধারিত হতো। ওমরের পরিবার সেই অর্থে ছিল প্রভাবশালী ও সম্মানিত।

তার মাতৃকুলও ছিল সমান মর্যাদাবান। মাতামহের পরিবার যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিল। ফলে একদিকে বিচারবুদ্ধি, অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্ব—দুই ধারার ঐতিহ্যই মিলিত হয়েছিল ওমরের ব্যক্তিত্বে।

যৌবনে পদার্পণ করে ওমর জীবিকার জন্য বেছে নিলেন ব্যবসা। মক্কা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। দক্ষিণের ইয়েমেন থেকে উত্তরাঞ্চলের শাম পর্যন্ত কাফেলা চলত নিয়মিত। এই বাণিজ্যপথ শুধু অর্থনীতির নয়, সভ্যতারও সেতুবন্ধন ছিল।

ব্যবসার সূত্রে ওমর সফর করেছেন সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে। মরুভূমির সীমানা পেরিয়ে তিনি দেখেছেন অন্য সমাজ, অন্য শাসনব্যবস্থা, অন্য সংস্কৃতি। বিভিন্ন জাতির মানুষের সঙ্গে মেলামেশা তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছিল।

একজন মানুষের চরিত্র গঠনে ভ্রমণের ভূমিকা গভীর।

নিজ গোত্রের বাইরে বেরিয়ে মানুষ বুঝতে শেখে পৃথিবী শুধু নিজের সমাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ওমরের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়িক সফর তাকে বিচিত্র মানবচরিত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্র পরিচালনার সময় তার যে অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা প্রকাশ পায়, তার পেছনে এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব জ্ঞান নিঃসন্দেহে মূল্যবান ভূমিকা রেখেছিল।

মানুষের আদর্শ পরিবর্তন হলেও তার শৈশব, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, পরিবার, সমাজ সবকিছু মিলে যে ব্যক্তিত্ব, স্বভাব ও প্রকৃতি গড়ে ওঠে তা পরিবর্তন হয় না। ইসলামের আগমনের পর ওমরের চরিত্রে যে বিপ্লব ঘটেছিল, তা তার পূর্বের শক্তিকে ধ্বংস করেনি; বরং তাকে নতুন দিশা দিয়েছিল। তার সাহস থেকে জন্ম নিয়েছিল সত্যের পক্ষে অবিচলতা, তার কঠোরতা রূপ নিয়েছিল ন্যায়বিচারে।

ওকাজের মেলার সেই বিজয়ী যুবক ছিলেন এক প্রস্তুতিমান ব্যক্তিত্ব। যার হৃদয় তখনও অন্ধকারে, কিন্তু যার সক্ষমতা ভবিষ্যতের এক মহৎ আলোর জন্য অপেক্ষমাণ।

মরুর ধুলোমাখা সেই যুবকই একদিন ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত হবেন আল-ফারুক নামে; সত্য ও মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয়কারী মানুষ হিসেবে। অথচ সেই আলোকোজ্জ্বল পরিচয়ের পূর্বে তার জীবন ছিল দাজনানের রৌদ্র, ওকাজের কোলাহল, উটের পাল, কবিতার আসর এবং শক্তির প্রতিযোগিতায় নির্মিত এক দীর্ঘ মানবিক প্রস্তুতির ইতিহাস।

ওমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম-পূর্ব জীবন জাহিলিয়াতের আরব সমাজকে বোঝারও এক জীবন্ত জানালা। অন্ধকারকে না বুঝলে আলোর মহিমাও উপলব্ধি করা যায় না। আর ওমরের জীবনের প্রথম অধ্যায় আমাদের সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের আলোর অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

তথ্যসূত্র

  • ১. মুহাম্মদ ইবন সা‘দ, তাবাকাতুল কুবরা

  • ২. আলী ইবনুল হাসান,তারিখু দিমাশক

  • ৩.  আহমদ ইবন ইয়াহইয়া,ফুতূহুল বুলদান

  • ৪. ইবন জারির তাবারি,তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক

  • ৫. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি, ওমর ইবনুল খাত্তাব: তাঁর জীবন ও সময়

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার