Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন না করলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ এএম

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন না করলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি এক ইসলামি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শায়খ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করাকে যারা বেদাত বলবে, তারা নাকি কাফের হয়ে যাবে এবং তাদের স্ত্রী নাকি অটোমেটিক তালাক হয়ে যাবে এ কথা কি সত্য? এ ছাড়া মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আমাদের করণীয় কী? রবিউল আউয়াল মাস চলছে, এই মাসে আমরা কী কী আমল করব?

উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন,

হিজরী বর্ষের মাসগুলোর মধ্যে রবিউল আউয়াল হলো তৃতীয় মাস। এই মাসটি রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের মাস এবং বহু ইতিহাসবিদের মতে তাঁর জন্ম লাভেরও মাস। যদিও তাঁর জন্মের সঠিক তারিখ বা মাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে এত মতপার্থক্য কেন? কারণ সেই যুগে মানুষ এখনকার মতো জন্মতারিখ সংরক্ষণের বিষয়ে অতটা গুরুত্ব দিত না। আজ থেকে ২০ বা ৩০ বছর আগেও গ্রামে-গঞ্জে সন্তান জন্ম নিলে অনেকে সুনির্দিষ্ট তারিখ নোট করে রাখতেন না, অথচ এখন জন্ম নিবন্ধনের কারণে সবাই তা লিখে রাখেন। ইতিহাস যত পেছনের দিকে যাবে, এই সংরক্ষণের বিষয়টি তত শিথিল ছিল।

যেদিন বিশ্বনবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন, সেদিন তিনি আল্লাহর কিতাবে ও জ্ঞানে নবী ছিলেন, কিন্তু মক্কার কোরায়শরা তা জানত না। তারা ভেবেছিল অন্যান্য দশটি সাধারণ শিশুর মতোই একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। ফলে একজন নবীর আগমনের বিষয়টি বিশ্ববাসী তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু যখন তিনি ইন্তেকাল করেন, ততদিনে সমগ্র বিশ্ব জেনে গেছে যে তিনি আল্লাহর চূড়ান্ত রাসুল। এ কারণেই তাঁর ওফাতের তারিখটি যেভাবে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে, তাঁর জন্মের দিনটি সেভাবে সুনির্দিষ্ট নয়।

ধরে নিলাম রবিউল আউয়াল মাসেই তাঁর জন্ম ও মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু তাই বলে এই মাসের জন্য বিশেষ কোনো আলাদা আমল বা ইবাদত নির্ধারিত নেই। ইসলামে মূল নির্দেশ হলো সারা বছর ও সারাজীবন রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহকে অনুসরণ করা, তাঁকে সকল সৃষ্টির চেয়ে বেশি ভালোবাস দেওয়া এবং তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করা। এই দাবিগুলো পূরণ করতে পারলে কেয়ামতের ময়দানে আমরা তাঁর শাফাআত ও জান্নাতের নেয়ামত পাওয়ার আশা করতে পারি।

কেবল রবিউল আউয়াল মাস এলে দু-একটি মিলাদ পড়া, কিয়াম করা বা মহব্বতের নামে কিছু প্রথা পালন করে যদি কেউ মনে করে যে দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, তবে তা মস্ত বড় ভুল। রবিউল আউয়াল চলে গেলে নবীজিকে ভুলে যাওয়ার নাম অনুসরণ নয়। ইসলামি বর্ষপঞ্জিতে যে চারটি হারাম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস রয়েছে (জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব) এবং রমজান মাসের যে বিশেষ ফজিলত রয়েছে, তা ব্যাতীত বাকি সকল মাসের বিধান সমান। এই মাসগুলোর জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আমল নির্ধারিত নেই।

তবে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মের দিন ছিল সোমবার। সুযোগ থাকলে প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নাহ। নবীজি নিজে সোমবারে রোজা রাখতেন এবং কারণ হিসেবে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। সুতরাং তাঁর জন্মকে কেন্দ্র করে কিছু করতে চাইলে সুন্নাহ সম্মত উপায় হলো সারা বছর প্রতি সপ্তাহে সোমবারে রোজা রাখা।

বছরে একদিন সাড়ম্বরে ‘জন্মবার্ষিকী’ পালনের এই সংস্কৃতি রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবিদের যুগে ছিল না। জন্মদিবস বা বার্ষিকী পালনের এই রীতি মূলত এসেছে পৌত্তলিক বা প্রকৃতিপূজারীদের সংস্কৃতি থেকে। এক সময় খ্রিস্টানেরাও এর তীব্র বিরোধিতা করলেও পরবর্তীকালে তারা ঈসার (আ.) নামে ক্রিসমাস বা জন্মোৎসব উদযাপন শুরু করে। তাদের দেখে একশ্রেণীর মুসলিমও মনে করতে লাগল যে, অন্যান্য জাতি যদি তাদের নবীর জন্মদিবস উদযাপন করে, তবে আমরা কেন আমাদের নবীর জন্মদিবস উদযাপন করব না? রাসুলুল্লাহ (সা.) আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়ে গেছেন যে, আমার উম্মত অমুসলিমদের অনুকরণ করতে গিয়ে তাদের প্রতিটি পদচিহ্ন অন্ধভাবে অনুসরণ করবে।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৬৩ বছর এবং তাঁর চার খলিফাসহ সাহাবিরা পরবর্তী বহু বছর ইসলামকে পরিচালনা করেছেন। খোদ মহানবী (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের এই দীর্ঘ সুবর্ণ যুগে একটি বছরের জন্যও নবীজির জন্মদিবস পালনের কোনো প্রমাণ মেলে না। আল্লাহর কাছে প্রশংসিত সেই সাহাবিদের চেয়ে আমরা নবীজিকে বেশি ভালোবাসি এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং যা নবীজি নিজে করেননি, যা তাঁর সাহাবিরা করেননি, তা খ্রিস্টানদের দেখে অনুকরণ করা ইসলাম নয়, বরং ইসলামের নামে এক ধরনের বিভ্রান্তি।

নবীজির প্রতি ভালোবাসার দাবি করলে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হতে হবে সুন্নাহর নীতি মেনে। অনেকেই বলেন, ‘ভালোবাসার কোনো প্রমাণ লাগে না, ভালোবাসলে যে কোনো কিছু করা যায়।’ অথচ কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে রাসুলুল্লাহর (সা.) অনুসরণ করো। অর্থাৎ রাসুলের (সা.) সুন্নাহ মেনে চলাই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণের একমাত্র মাপকাঠি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়ে গেছেন; আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর সুন্নাহ। কোনো আমল যদি এই দুটির মধ্যে না থাকে, তবে দ্বীনের নামে নতুন উদ্ভাবিত সেই বস্তুকে ‘বেদাত’ বলা হয়, যার পরিণতি গোমরাহী ও জাহান্নাম।

আমাদের যে সকল ভাই মিলাদুন্নবী উদযাপন করেন, তারা নিশ্চয়ই নবীজির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগ থেকেই তা করেন এবং এই ভালোবাসা প্রশংসনীয়। কিন্তু ভালোবাসার চর্চাটি হতে হবে সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ইগো বা কাদা ছোড়াছুড়ি করা অনুচিত। বিনয়ের সাথে সত্য তুলে ধরতে হবে এবং ভিন্নমত পোষণকারী ভাই ভুল করলে তাঁর প্রতি ক্ষোভ বা শত্রুতা পোষণের বদলে সহানুভূতি ও দয়ার মানসিকতা রাখতে হবে।

‘মিলাদুন্নবীকে বেদাত বললে মানুষ কাফের হয়ে যাবে বা স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে’—এমন কথা অত্যন্ত অযৌক্তিক। তারা হয়তো বোঝাতে চান যে, নবীজির অবমাননা বা দুশমনি করলে ঈমান থাকে না। কিন্তু সুন্নাহকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরে নতুন উদ্ভাবিত সংস্কৃতি থেকে বেঁচে থাকা কি নবীজির আনুগত্য, নাকি তাঁর অবমাননা? আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, দ্বীনের ভেতরে নতুন কিছু তৈরি করলে তা বাতিল। সেই ভয় থেকে কেউ যদি সাহাবিদের যুগে না থাকা সংস্কৃতি এড়িয়ে চলে, তবে তো সে সাচ্চা অনুসারী হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে।

বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। ধরুন, আপনি কাউকে বললেন, ‘আপনি যদি ভালো মানুষ হন, তবে আমাকে এক কাপ চা খাওয়ান।’ সে চা খাওয়াল না, আর আপনি তাকে খারাপ মানুষ হিসেবে ফতোয়া দিয়ে দিলেন। নিজের মনমতো একটি মানদণ্ড বানিয়ে সবাইকে মূল্যায়ন করা যেমন ভুল, তেমনি মিলাদুন্নবী উদযাপন না করলেই কাউকে ‘নবীর দুশমন’ বানিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া কাজ।

যেমন আমাদের ভাষা আন্দোলন বা স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি আমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞ এবং তাঁদের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করি। এখন কেউ যদি শহীদদের স্মরণে ১০ লাখ টাকার অনুষ্ঠান করে আপনার কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করে এবং আপনি চাঁদা না দিলে আপনাকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়, তবে তা যেমন হাস্যকর, মিলাদুন্নবী উদযাপন না করলে কাউকে কাফের বা নবীর দুশমন বলাও ঠিক তেমনি এক চরম ভুল ও বিভ্রান্তিকর আচরণ। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার