বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সোমবার—এ ব্যাপারে সকল ইতিহাস ও সিরাত বিশেষজ্ঞ একমত। হাদিস থেকেই এটা প্রমাণিত। একবার নবীজিকে তাঁর সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে অথবা এ দিনে আমার উপর ওহি অবতীর্ণ হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
নবীজির জন্মের আরেকটা বিষয়ে প্রায় সকলে একমত। সেটা হলো- নবীজির জন্ম হয়েছিল তৎকালীন ইয়েমেনের খ্রিষ্টান বাদশাহ আবরাহা তার শক্তিশালী হাতিবাহিনীর মাধ্যমে কাবা আক্রমণের ঘটনার বছর।
এ ব্যাপারে ইতিহাস ও সিরাতবিদদের মতামত হলো-
নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাকের মতে নবীজির (সা.)-র জন্ম হয়েছিল আবরাহার হাতিবাহিনীর মাধ্যমে কাবা আক্রমণের বছর।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, এটা নিশ্চিত যে রাসুল (সা.) হাতিবাহিনীর মক্কা অভিযানের বছর জন্মগ্রহণ করেন। (যাদুল মাআদ: ১/৭৬)
ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, এটিই অধিকাংশ আলেমদের মত। ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইবনে মুনযির, খলিফা ইবনে খাইয়্যাত, ইবনুল জাযযার, ইবনে দিহইয়াহ, ইবনুল জাওযি ও ইবনুল কাইয়িম প্রমুখ আলেমদের মতে নবিজির (সা.) জন্ম হাতিবাহিনীর মক্কা আক্রমণের বছর হওয়ার ব্যপাররে নবিজির সব জীবনীকারগণের ইজমা’ বা ঐকমত্য রয়েছে।
হাতিবাহিনীর ঘটনা কবে ঘটেছিল?
এখানে প্রশ্ন দেখা দেয়, আসলে হাতিবাহিনীর ঘটনা কবে কোন বছর ঘটেছিল? ইতিহাসবিদরা এর জবাবে বলেন, হাতিবাহিনীর ঘটনা ঘটেছিল- ৫৭০ বা ৫৭১ খৃষ্টাব্দে। এ হিসেবে মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় নবীজির (সা.) জন্ম হয়েছিলো ৫৭০ বা ৫৭১ খৃষ্টাব্দে। এর মধ্যে ৫৭১ খৃষ্টাব্দ তার জন্মসন হওয়ার তথ্যটি বেশি প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী।
নবীজির জন্ম তারিখ
এর পর যে মতভেদ লক্ষ করা যায়, সেটা হলো প্রধান মতপার্থক্যের স্থান। অর্থাৎ ১২ রবিউল আউয়াল। অনেক আলেমগণ এ দিনকে কেন্দ্র করে নবীজির জন্ম তারিখ মেনে নিলেও—এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতপার্থক্য।
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ তো রবিউল আউয়াল মাসকেই নবীজির জন্ম তারিখ হওয়ার ক্ষেত্রে অস্বীকার করেছেন। তারা রমজান বা সফর মাসকে উল্লেখ করে থাকেন। তাদের এই মতামতের উর্ধ্বে উঠে অধিকাংশ ইতিহাস ও সিরাতবিদ রবিউল আউয়ালকেই ধরে নিয়েছেন নবীজির জন্মমাস।
নবীজির জন্ম তারিখের বেলায় বেশ কিছু মত পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেশিরভাগ ৮, ৯, ১০ বা ১২ তারিখের কথা বলেছেন। কেউ কেউ ২ তারিখও বলেছেন।
তবে রাসুলের (রা.) জন্মতারিখ ১২ রবিউল আওয়াল হওয়ার মতটি অধিকাংশ আলেমদের কাছে বেশি প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। ইবনে আবু শাইবা তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি দুজন সাহাবি জাবের (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন, ‘রাসুল (সা.) হাতিবাহিনীর মক্কা আক্রমণের বছর, ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান। অধিকাংশ আলেমদের কাছে এ মতটিই বেশী প্রসিদ্ধ।’ (আস-সিরাতুন নববিয়াহ: ১/১৯৯)
কিছু মুসলিম গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা করে বের করেছেন—হাতিবাহিনীর মক্কা আক্রমণের বছর রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সোমবার ছিল। তাই তারা বলেন নবিজির জন্ম হয়েছিলো ৯ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ৫৭১ খৃষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল। সমকালীন প্রসিদ্ধ সিরাতগ্রন্থ ‘আর-রাহিকুল মাখতুম’-এর লেখক শফিউর রহমান মোবারকপুরিসহ সাম্প্রতিক অনেক সিরাতলেখক এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন
এ ক্ষেত্রে জেনে রাখা জরুরি—১২ রবিউল আউয়ালে নবীজির জন্মদিন হওয়া নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও তাঁর মৃত্যু তারিখ যে ১২ রবিউল আউয়াল—এ ব্যাপারে মুসলিম-অমুসলিম সকল ইতিহাসবিদ একমত এবং এটাই নিশ্চিত তারিখ তার মৃত্যুর। রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার সন্ধ্যায় আয়েশার (রা.) ঘরে ৬৩ বছর বয়সে নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করেন।
কেনো এই মতপার্থক্য?
এই কথা তো অনস্বীকার্য যে, নবীজি এমন এক সময়ে এমন এক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছেন, যে সময়টাকে আজো ‘আইয়ামে জাহিলিয়্যাহ’ বা মূর্খতার যুগ বলা হয়। সে ছিল ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। যে সময়ে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া ছিল মুশকিল, সে সময়ে মক্কার আবদুল্লাহর ঘরে আমেনার গর্ভ থেকে এক এতিম সন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন—এ তারিখ কে লিখে রাখে। তবুও হয়তো কেউ কেউ লিখে রাখত—যদি তারা জানতে পারতো এ শিশু হলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট মানবফুল। যুগযুগান্তর ধরে যাঁর অপেক্ষায়ে পথ চেয়ে আছে সৃষ্টিকুল।
পক্ষান্তরে, নবীজি যেদিন পৃথিবী চিরবিদায় জানান, ততদিনে এমন এক জাতি তিনি নিজ হাতে গড়তে শতভাগ সক্ষম হয়েছিলেন, যারা আদর্শে, শ্রেষ্ঠত্বে, জ্ঞান ও শিক্ষায় ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তার তাদের সবার হৃদয়ের শীর্ষে আসীন ছিলেন, নবীজি মুহাম্মদ সা.।
পুনশ্চ, যদি সব মতপার্থক্য একপাশে রেখে ধরেও নেওয়া হয়—নবীজির জন্ম হয়েছিল ১২ রবিউল আউয়াল। এবং তার মৃত্যুও এই একই তারিখে। তাহলে এ দিন কোনটা পালনীয় যুক্তিসঙ্গত? প্রাণের নবীজির মৃত্যুর দিনকে জন্ম তারিখ হিসেব করে সভা-মাহফিল করে আনন্দ-উল্লাস, নাকি শোকপালনে দোয়া-দরুদ পাঠ?
বলাই বাহুল্য, এ দিন যে নবীজির মৃত্যু তারিখ—এ ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই। এটাই শতভাগ সত্য।