বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিশ্বজাহানের প্রতিটি ধূলিকণা থেকে শুরু করে সুবিশাল আকাশমণ্ডলী পর্যন্ত যা কিছু অস্তিত্বশীল, সবই মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি বা মাখলুকাত। আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ‘আল্লাহ তাআলা আঠারো হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন।’ তবে বিশুদ্ধ ইসলামি দলিলের আলোকে সৃষ্টিজগতের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা গভীরভাবে অনুধাবন করা ইমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাখলুকাতের সংখ্যা প্রসঙ্গে মূল বক্তব্য
কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের সুস্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। সৃষ্টিজগৎ অসীম, অসংখ্য ও অগণিত—যার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকটই রয়েছে। তাফসিরের কিতাবসমূহে পূর্ববর্তী আলেম ও মুফাসসিরদের কিছু ব্যক্তিগত অভিমত ও বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে ১ হাজার, ১৪ হাজার, ১৮ হাজার কিংবা ৮০ হাজার জগতের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ সংখ্যা নয়, বরং সৃষ্টির বিশালতা বোঝাতে রূপক বা তৎকালীন ধারণার ভিত্তিতে ব্যক্ত হয়েছে।
কুরআনুল কারিমের দলিল
মহান আল্লাহর সৃষ্টি ও তার বাহিনীর সংখ্যা মানুষের ধারণাতীত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلاَّ هُوَ
‘আর আপনার প্রতিপালকের বাহিনীসমূহ সম্পর্কে তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানে না।’ (সুরা আল-মুদ্দাচ্ছির: আয়াত ৩১)
তাফসির ও আসার থেকে বর্ণিত বিভিন্ন অভিমত
১. হজরত আবুল আলিয়াহ (রহ.)-এর বর্ণনা
عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ: رَبِّ الْعَالَمِينَ قَالَ: الإِنْسُ عَالَمٌ وَالْجِنُّ عَالَمٌ، وَمَا سِوَى ذَلِكَ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ أَلْفَ عَالَمٍ، أَوْ أَرْبَعَةَ عَشَر أَلْفَ عَالَمٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ
‘আবুল আলিয়াহ (রহ.) থেকে বর্ণিত; মহান আল্লাহর বাণী ‘রব্বিল আলামিন’ (সমগ্র জগতের প্রতিপালক)-এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘মানবজাতি একটি জগত এবং জিনজাতি একটি জগত। আর এ দুটো ছাড়া ফেরেশতাদের আঠারো হাজার জগত অথবা চৌদ্দ হাজার জগত রয়েছে।’ (তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, হাদিস/বর্ণনা নং ৭৩০৫; তাফসিরে তাবারি, বর্ণনা নং ১৬৪)
২. হজরত তাবি‘ (রহ.)-এর বর্ণনা
عَنْ مُغِيثِ بْنِ سُمَيٍّ، عَنْ تَبِيعٍ فِي قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: الْعَالَمِينَ قَالَ: الْعَالَمُونَ أَلْفُ أُمَّةٍ فَسُتُّمِائَةٍ فِي الْبَحْرِ وَأَرْبَعُمِائَةٍ فِي الْبِرِّ
হজরত মুগিস ইবনে সুমাই (রহ.) থেকে বর্ণিত; তিনি তাবি‘ (রহ.) থেকে আল্লাহর বাণী ‘আল-আলামীন’-এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘সমগ্র জগত বা সৃষ্টিজগতে এক হাজার জাতি/প্রজাতি রয়েছে; যার মধ্যে ছয়শত জলভাগে (সমুদ্রে) এবং চারশত স্থলভাগে বাস করে।’ (তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, বর্ণনা নং ৮৯১৩)
وعن وهب أيضاً، يرفعه إلى النبي عليه السلام، أنه قال: «إن لله [عز وجل] ثمانية [عشر] [ألف] عالم
হজরত ওয়াহাব (রহ.) থেকে বর্ণিত; তিনি তা নবী করীম (সা.)-এর বরাতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (নবীজি) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর আঠারো হাজার জগত রয়েছে।’ (আল-হিদায়াহ ইলা বুলুগিন নিহায়াহ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯৫৬)
মাখলুকাতকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার গণ্ডিতে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। ‘আঠারো হাজার মাখলুকাত’ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সনদের দিক থেকে সর্বসম্মত ও চূড়ান্ত নয়, বরং বিভিন্ন সাহাবি ও তাবেয়িদের ব্যাখ্যামূলক মতামত। তাই একজন মুমিনের জন্য সঠিক ও নির্ভুল বিশ্বাস হলো— মহান রবের সৃষ্টিজগৎ অগণিত ও সীমাহীন, যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব কেবল তিনিই রাখেন। বিশ্বজগতের এই অনন্ত বিস্তৃতি মহান স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বকেই প্রমাণ করে।