বিজ্ঞাপন
পোস্ট অফিসে টাকা রেখে লভ্যাংশ নিলে কি হালাল হবে?
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০ পিএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সঞ্চয়ের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হলো পোস্ট অফিস সঞ্চয় প্রকল্প ও সঞ্চয়পত্র। নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট হারে মুনাফার নিশ্চয়তার কারণে অসংখ্য মানুষ, বিশেষত অবসরভোগী, প্রবাসী ও মধ্যবিত্ত পরিবার, এখানে টাকা জমা রাখেন।
প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত ‘লভ্যাংশ’ বা মুনাফা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল, নাকি এটি সুদ তথা রিবা হিসেবে গণ্য হবে এবং হারাম হবে।
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ইসলামি ফিকহে ঋণ ও বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য কী, এরপর দেখতে হবে পোস্ট অফিসের লেনদেন প্রকৃতপক্ষে কোন শ্রেণিতে পড়ে।
ইসলামি অর্থব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, মুনাফা হালাল হওয়ার জন্য তা ঝুঁকি বহনকারী প্রকৃত ব্যবসা বা অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগ থেকে আসতে হবে, যেমন মুদারাবা কিংবা মুশারাকা পদ্ধতিতে, যেখানে লাভ ও লোকসান উভয়ের সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে।
এই মূলনীতিটি ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়া এবং পরবর্তী সময়ে রচিত ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও ঋণচুক্তির মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে।
ইবনে আবেদীন শামীর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতারেও একই মূলনীতির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, ঋণচুক্তিতে কোনো প্রকার শর্তযুক্ত বাড়তি অর্থ গ্রহণ করলে তা সরাসরি রিবাতে পরিণত হয়, তা যত সামান্য পরিমাণেই হোক না কেন।
বিপরীতে, যদি কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা জমা রাখে এবং পূর্বনির্ধারিত, নিশ্চিত হারে বাড়তি অর্থ ফেরত পায়, আসল টাকার সঙ্গে ব্যবসায়িক ঝুঁকির কোনো প্রকৃত সম্পর্ক না রেখেই, তাহলে অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে এটি প্রকৃতপক্ষে ঋণ তথা কর্জ, এবং তার ওপর নির্ধারিত বাড়তি অর্থ হলো সুদ।
পোস্ট অফিস সঞ্চয়পত্র ও সঞ্চয় হিসাবের কাঠামো এই দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যেই পড়ে। গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে সরকারকে টাকা ধার দেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট, পূর্বনির্ধারিত হারে মুনাফা পান, যেখানে ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির কোনো প্রকৃত অংশীদারত্ব থাকে না।
সমকালীন ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি তাকী উসমানী তার প্রসিদ্ধ রচনা ‘ইসলাম অ্যান্ড মডার্ন ইকোনমিকস’ ও অন্যান্য লেখায় এই ধরনের সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পকে সুদভিত্তিক লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, কেননা এতে আসল অর্থের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট মুনাফা উভয়ই নিশ্চিত থাকে, যা প্রকৃত ব্যবসায়িক চুক্তির বৈশিষ্ট্যবিরোধী।
সুদ সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর। সুরা বাকারার ২৭৫ থেকে ২৭৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং একে ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি পার্থক্য করে দেখিয়েছেন, ব্যবসা হালাল কিন্তু সুদ হারাম। এমনকি সুদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণার মতো কঠোর সতর্কবার্তাও এসেছে এই আয়াতগুলোতে।
সুরা আলে ইমরানের ১৩০ নম্বর আয়াতেও মুমিনদের চক্রবৃদ্ধি সুদ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদিসের ক্ষেত্রে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদদাতা, সুদ গ্রহণকারী, সুদের চুক্তি লিপিবদ্ধকারী ও তার সাক্ষী সবাইকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান দায়ী।
জামে তিরমিযি ও সুনানে আবু দাউদের বর্ণনাতেও সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে একাধিক হাদিস এসেছে, যেখানে সুদকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই কুরআনি ও হাদিসগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে অধিকাংশ ফিকহবিদ একমত যে, নির্দিষ্ট হারে নিশ্চিত বাড়তি অর্থ প্রদানকারী যেকোনো সঞ্চয় ব্যবস্থা, তা বেসরকারি ব্যাংক হোক বা সরকারি পোস্ট অফিস, মূলনীতিগতভাবে রিবার আওতায় পড়ে।
বিভিন্ন দেশের প্রসিদ্ধ ফতোয়া বোর্ড ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের অভিমত এ ক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সঞ্চয়পত্র, পোস্ট অফিস স্কিম ও ব্যাংক এফডিআরের নির্দিষ্ট মুনাফাকে সুদ হিসেবে ফতোয়া দিয়ে আসছে।
পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর এবং করাচির দারুল উলুম করাচির ফতোয়া বিভাগও একই অভিমত পোষণ করে, যা মুফতি তাকী উসমানীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামি অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের হাটহাজারী মাদ্রাসা তথা আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম এবং দেশের প্রায় সব প্রধান কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ফতোয়া বিভাগও অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে যে, পোস্ট অফিস সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় হিসাব থেকে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট হারের মুনাফা সুদের অন্তর্ভুক্ত এবং তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
এ ছাড়া মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া কমিটি এবং জেদ্দাভিত্তিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, যা ওআইসির অধীনে পরিচালিত, উভয়েই তাদের প্রকাশিত সিদ্ধান্তে ব্যাংক আমানত ও সরকারি বন্ডের নির্দিষ্ট সুদকে রিবা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যদিও কিছু আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ ব্যাংক সুদকে ‘মূল্যস্ফীতির ক্ষতিপূরণ’ বলে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তবে এই মত সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং একে দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত মত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে আলেমদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে মূল আসল টাকা ও অতিরিক্ত মুনাফার ব্যবহারবিধি নিয়ে। প্রায় সর্বসম্মত অভিমত হলো, মূল আসল টাকা নিজের কাছে ফেরত নেওয়া জায়েজ, কেননা তা নিজের সম্পদ এবং তাতে কোনো হারাম উপাদান নেই।
কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফা নিজের ভোগে ব্যবহার করা যাবে না, বরং সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব-দুঃখী, এতিম কিংবা সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে তা দান করে দিতে হবে।
ইমাম দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগসহ অধিকাংশ সমসাময়িক মুফতি একমত যে, এই দান মূলত সদকা নয়, বরং হারাম সম্পদ থেকে আত্মশুদ্ধির একটি পন্থা, তাই এতে সওয়াবের প্রত্যাশা করা যাবে না। বাহিশতী জেওরসহ প্রচলিত আমভাবে পঠিত ফিকহি রচনাগুলোতেও একই নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, হারাম উপার্জন নিজের কাছে রাখা যাবে না বরং তা সমাজকল্যাণে ব্যয় করে দিতে হবে।
কিছু সমসাময়িক আলেম, বিশেষত যারা প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনা করেন, বলে থাকেন যে যদি কারও কাছে কোনো সুদমুক্ত তথা শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প সঞ্চয় মাধ্যম সহজলভ্য না থাকে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবু এই বাস্তবতা সুদ গ্রহণের অনুমতির কারণ হতে পারে না।
বরং তারা মুসলিম উম্মাহকে ইসলামি ব্যাংকিং, শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা সঞ্চয় প্রকল্প ও ওয়াকফভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেন, যাতে সাধারণ মানুষ সুদমুক্তভাবে সঞ্চয় করতে পারে। অর্থাৎ, প্রয়োজন বা অপারগতার যুক্তিতে সুদকে হালাল ঘোষণার কোনো সুযোগ ফিকহে নেই, বরং প্রয়োজনের সমাধান হলো বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।
সামগ্রিকভাবে, কুরআন, হাদিস ও বিভিন্ন দেশের প্রসিদ্ধ ফতোয়া বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বলা যায় যে, পোস্ট অফিস সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় হিসাবে টাকা জমা রেখে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা গ্রহণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদ এবং তা হারাম। আসল জমাকৃত অর্থ ফেরত নেওয়া জায়েজ, তবে অতিরিক্ত মুনাফা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় না করে সওয়াবের আশা ছাড়া দান করে দেওয়াই শরিয়তসম্মত পন্থা।
যাদের কাছে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প সঞ্চয় মাধ্যম সহজলভ্য, তাদের ক্রমান্বয়ে সে দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। তবে যেকোনো ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্তের আগে নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য মুফতি বা ফতোয়া বোর্ডের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, কেননা ব্যক্তিবিশেষে পরিস্থিতির ভিন্নতা অনুযায়ী মাসআলার প্রয়োগেও পার্থক্য হতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর