Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে?

Icon

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩১ এএম

রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে?

বিজ্ঞাপন

নামাজ শুধু কিছু শারীরিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি নয়; এটি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে বান্দার গভীরতম আত্মিক সংযোগের এক অনন্য ইবাদত। এই ইবাদতের প্রাণ হলো খুশু-খুজু—অর্থাৎ বিনয়, একাগ্রতা ও হৃদয়ের উপস্থিতি। আর সেই একাগ্রতা বজায় রাখতে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে— রুকুর সময় চোখ কোথায় রাখা সুন্নাহ? সেজদার স্থানে, পায়ের দিকে, নাকি অন্য কোথাও? এ বিষয়ে কুরআন, সহিহ হাদিস ও ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা কী বলে—চলুন দলিলের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।

নামাজে খুশু-খুজুর গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ۝ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে; যারা নিজেদের নামাজে বিনয় ও একাগ্রতা (খুশু-খুজু) অবলম্বন করে। (সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ১-২)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, সালাতের বাহ্যিক শুদ্ধতার পাশাপাশি অন্তরের একাগ্রতাও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে—সহিহ হাদিসে কী পাওয়া যায়?

রুকুর সময় দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো স্থানে রাখার বিষয়ে সহিহ হাদিসে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দৃষ্টি সংযত রাখা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে চারদিকে না তাকানোর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন—

لَيَنْتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ يَرْفَعُونَ أَبْصَارَهُمْ إِلَى السَّمَاءِ فِي الصَّلَاةِ أَوْ لَتُخْطَفَنَّ أَبْصَارُهُمْ

‘লোকেরা যেন নামাজে আকাশের দিকে দৃষ্টি তোলা থেকে বিরত থাকে; অন্যথায় তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া হতে পারে।’ (বুখারি ৭৫০, মুসলিম ৪২৯)

আরেক হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—

سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الِالْتِفَاتِ فِي الصَّلَاةِ، فَقَالَ: هُوَ اخْتِلَاسٌ يَخْتَلِسُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ صَلَاةِ الْعَبْدِ

‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নামাজে এদিক-সেদিক তাকানোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, এটি এমন এক ধরনের ছিনতাই, যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার নামাজ থেকে কিছু অংশ ছিনিয়ে নেয়।’ (বুখারি ৭৫১)

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, নামাজে অপ্রয়োজনীয়ভাবে চারদিকে বা আকাশের দিকে তাকানো সুন্নাহবিরোধী। দৃষ্টি স্থির রাখা খুশু-খুজু অর্জনে সহায়ক।

ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা

হানাফি ফকিহদের মতে, সালাতের প্রতিটি অবস্থায় এমন স্থানে দৃষ্টি রাখা মোস্তাহাব, যা একাগ্রতা ও বিনয় বজায় রাখতে সাহায্য করে।

তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী—

  • কিয়াম (দাঁড়ানো অবস্থায়): সেজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা।
  • রুকুতে: দুই পায়ের মাঝামাঝি অংশ বা পায়ের আঙুলের দিকে দৃষ্টি রাখা।
  • সেজদায়: নাকের দুই পাশের দিকে দৃষ্টি রাখা।
  • তাশাহহুদে: কোলের দিকে দৃষ্টি রাখা।

তবে এসব নির্দেশনা ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং মোস্তাহাব ও নামাজের আদব। মূল উদ্দেশ্য হলো খুশু-খুজু বজায় রাখা।

অন্যান্য মাজহাবের মতামত

এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে।

হানাফি মাজহাব: রুকুর সময় পায়ের আঙুল বা নিচের দিকে দৃষ্টি রাখা মোস্তাহাব।

শাফেয়ি মাজহাবের অধিকাংশ আলেম: রুকুসহ নামাজের সব অবস্থায় সেজদার স্থানের দিকে দৃষ্টি রাখা উত্তম।

যদিও মতের ভিন্নতা রয়েছে, উভয় মতের উদ্দেশ্য একটিই— নামাজে পূর্ণ একাগ্রতা ও খুশু-খুজু অর্জন।

রুকুতে মাথা ও দৃষ্টির অবস্থান

রুকুর সময় নিচের দিকে দৃষ্টি রাখার অর্থ এই নয় যে মাথা অতিরিক্ত নিচু করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রুকুর বর্ণনায় এসেছে—

كَانَ إِذَا رَكَعَ لَمْ يُشْخِصْ رَأْسَهُ وَلَمْ يُصَوِّبْهُ وَلَكِنْ بَيْنَ ذَلِكَ

‘তিনি যখন রুকু করতেন, তখন মাথা খুব বেশি উঁচুও করতেন না এবং অতিরিক্ত নিচুও করতেন না; বরং মাঝামাঝি সমান্তরাল অবস্থায় রাখতেন।’ (মুসলিম ৪৯৮)

অতএব, পিঠ সোজা ও মাথা সমান্তরাল রেখে রুকু আদায় করাই সুন্নাহ।

রুকুতে চোখ বন্ধ করার বিধান

অনেকেই একাগ্রতা বাড়ানোর জন্য রুকু বা সেজদায় চোখ বন্ধ রাখেন।

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, অকারণে নামাজে চোখ বন্ধ রাখা মাকরুহ। তবে সামনে এমন কিছু থাকলে যা মনোযোগ নষ্ট করে, তখন একাগ্রতা রক্ষার জন্য চোখ বন্ধ রাখার অবকাশ রয়েছে। (মারাকিল ফালাহ ১/১১০)

কেন দৃষ্টি স্থির রাখা গুরুত্বপূর্ণ?

নামাজে দৃষ্টি স্থির রাখলে—

  • মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।
  • অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ও বিভ্রান্তি কমে।
  • খুশু-খুজু অর্জন সহজ হয়।
  • আল্লাহর সামনে বিনয় ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি গভীর হয়।

এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম দৃষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ রাখাকে সালাতের আদবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

আরও পড়ুন
একজন মুসল্লির করণীয়

রুকুর সময় একজন মুসল্লির উচিত—

  • অপ্রয়োজনীয়ভাবে চারদিকে না তাকানো।
  • হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পায়ের আঙুলের দিকে বা নিচের দিকে দৃষ্টি রাখা।
  • মাথা ও পিঠ সমান্তরাল রেখে সুন্নাহ অনুযায়ী রুকু আদায় করা।
  • «سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ» — "আমার মহান প্রতিপালক কতই না পবিত্র"—এই তাসবিহ অর্থ ও ভাব উপলব্ধি করে পড়ার চেষ্টা করা।
  • পুরো সালাতে খুশু-খুজু ও একাগ্রতা বজায় রাখার আন্তরিক চেষ্টা করা।

রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে—এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দৃষ্টি সংযত রাখা, এদিক-সেদিক না তাকানো এবং খুশু-খুজু বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ফুকাহায়ে কেরামও সেই উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাই এ বিষয়কে বিতর্কের কারণ না বানিয়ে, সুন্নাহর আদব অনুসরণ করে বিনয়, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে নামাজ আদায় করাই একজন মুমিনের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খুশু-খুজুসম্পন্ন সালাত আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার