বিজ্ঞাপন
অল্প বয়সে চুল পাকলে কালো কলপ: শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি অবৈধ?
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
বিজ্ঞাপন
মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য অধ্যায় হলো বার্ধক্য। মহান আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে যায়। তবে অনেকের ক্ষেত্রে বংশগত, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে অল্প বয়সেই চুল পেকে যেতে পারে। নিজের সৌন্দর্য বা তারুণ্য ধরে রাখতে অনেকে চুলে বিভিন্ন ধরনের কলপ বা রং ব্যবহার করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সব ধরনের রং কি বৈধ? বিশেষ করে কালো কলপ ব্যবহার সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশনা কী? এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক বিধান জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সাদা চুল-দাড়িতে কালো ছাড়া অন্য রং ব্যবহার করা বৈধ
নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালে মানুষের চুল-দাড়ি সাদা হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ইসলাম এ স্বাভাবিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করেনি। বরং সাদা চুল-দাড়িতে কালো ছাড়া অন্য কোনো রং—যেমন মেহেদি বা হলদে-লালচে রং—ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে।
হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-এর পিতা আবু কুহাফা (রা.)-এর সাদা চুল ও দাড়ি দেখে বলেন—
غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ
‘এটিকে (সাদা চুল-দাড়িকে) কোনো কিছুর মাধ্যমে পরিবর্তন করো, তবে কালো রং থেকে বিরত থাকো।’ (মুসলিম ২১০২, ৫৪৬৬)
এ হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাদা চুল-দাড়িতে কালো ছাড়া অন্য রং ব্যবহার করা জায়েয।
বার্ধক্য গোপনের উদ্দেশ্যে কালো কলপ ব্যবহার নিষিদ্ধ
শরিয়তের দৃষ্টিতে বার্ধক্য লুকানোর উদ্দেশ্যে কুচকুচে কালো কলপ ব্যবহার করা বৈধ নয়। কারণ এতে মানুষকে নিজের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করা হয়, যা এক ধরনের প্রতারণার শামিল।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَكُونُ قَوْمٌ يَخْضِبُونَ فِي آخِرِ الزَّمَانِ بِالسَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ، لَا يَرِيحُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
‘শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায় হবে, যারা কবুতরের বুকের মতো কালো রং দিয়ে (চুল-দাড়ি) রাঙাবে। তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (আবু দাউদ ৪২১২)
এ হাদিসে কালো কলপ ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ের কেমিক্যালযুক্ত কালো রংয়ের বিধান
বর্তমানে বাজারে এমন অনেক কেমিক্যালযুক্ত হেয়ার কালার পাওয়া যায়, যেগুলোর নাম ‘মেহেদি’ হলেও বাস্তবে তা সম্পূর্ণ কালো রং ধারণ করে। এ ধরনের কুচকুচে কালো রংও একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। তাই এগুলো ব্যবহার করা বৈধ নয়।
তবে কোনো কলপ যদি সম্পূর্ণ কালো না হয়ে বাদামি, লালচে বা কালো-লাল মিশ্র রঙের হয়, তাহলে অনেক আলেম তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।
অনেক সময় অসুস্থতা, বংশগত কারণ বা অন্য কোনো কারণে কম বয়সেই চুল বা দাড়ি সাদা হয়ে যায়। অথচ ব্যক্তি বাস্তবে বৃদ্ধ নন। এমন ক্ষেত্রে অনেক ফকিহ ও আলেম মত দিয়েছেন যে, কালো কলপ ব্যবহার করার অবকাশ রয়েছে। কারণ এখানে বার্ধক্য গোপনের উদ্দেশ্য নেই; বরং অস্বাভাবিকভাবে সাদা হয়ে যাওয়া চুলকে স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচিত হয়। (ফায়জুল কাদির ১/৩৩৬)
যুবকদের জন্য করণীয়
যদিও কিছু আলেম অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে কালো কলপ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, তবুও যেহেতু হাদিসে কালো রং সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা এসেছে, তাই অধিকাংশ আলেমের মতে সতর্কতা অবলম্বন করাই উত্তম। এ কারণে যুবকদের উচিত কুচকুচে কালো রং ব্যবহার না করে মেহেদি, বাদামি কিংবা লাল-কালো মিশ্রিত রং ব্যবহার করা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/১৫৪)
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করেছে, তবে তা যেন শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। বয়সজনিত সাদা চুল-দাড়িতে কালো কলপ ব্যবহার থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বিরত থাকতে বলেছেন। অন্যদিকে কালো ছাড়া বৈধ রং ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। আর কম বয়সে অস্বাভাবিকভাবে চুল পেকে গেলে সে বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সতর্কতার পথ অবলম্বন করাই একজন মুত্তাকি মুসলিমের জন্য অধিক নিরাপদ। তাই ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলা এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।