বিজ্ঞাপন
গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদ এক শতাব্দীর মুসলিম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ এএম
বিজ্ঞাপন
আজও মনে আছে সেই দিনটির কথা। ২০১৪ সালের ঈদ। দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদের বিশাল জামাতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়েছিলাম।
চারদিকে অচেনা মুখ, কিন্তু তাকবিরের ধ্বনি শুনে মনে হয়েছিল, মানুষ বদলায়, দেশ বদলায়, আল্লাহর ঘর বদলায় না। সেই ঈদের সকালটিতে আমার পাশে ছিলেন স্কটল্যাল্ড প্রবাসী সাগর, রানা, শোভন,আশরাফ, রুবেলরা।
বারো বছর পর আবার সেই মসজিদে ফিরলাম। এবার ঈদের দিন নয়, জুমার দিন। আবারও পাশে আশরাফ। সঙ্গে যোগ হয়েছে ড. সাইফ। সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, জীবনের অনেক গল্প জমেছে। অজু করে মসজিদের কার্পেটে দাঁড়াতেই মনে হলো, সময় কোথাও থেমে ছিল। শুধু আমরা একটু বয়স্ক হয়েছি।
মসজিদের মিনারের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এই ভবন হাজারো মানুষের প্রার্থনা, অভিবাসনের ইতিহাস, অশ্রু, সংগ্রাম আর বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
গ্লাসগো শহরের দক্ষিণ তীরে, ক্লাইড নদীর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের এই স্থাপনাটি স্কটল্যান্ডের মুসলিম সমাজের হৃদস্পন্দন। প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার মুসল্লির পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রমজান, ঈদ কিংবা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
জুমার আজান শুরুর আগেই চারপাশের ফুটপাথ ভরে যেতে থাকে মানুষের পদচারণায়। পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, ভারতীয়, আরব, আফ্রিকান, তুর্কি, সোমালি, মালয়েশীয় কত দেশের মানুষ! কাতারে দাঁড়ানোর পর সবাই শুধু মুসল্লি। কেউ কারও ভাষা জানেন না, সবাই একই দোয়া পড়েন।
গ্লাসগোতে মুসলিমদের ইতিহাসও আজকের নয়।বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা শ্রমজীবী মুসলমানেরা গর্বালস এলাকায় বসতি গড়তে শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়াত ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমিন। এরপর ১৯৪৪ সালে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের একটি ভবনকে রূপান্তর করা হয় স্কটল্যান্ডের প্রথম মসজিদে। সময়ের সঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ছোট্ট সেই মসজিদ আর প্রয়োজন মেটাতে পারছিল না। তারপর শুরু হয় নতুন স্বপ্নের গল্প।
মিউনিটির মানুষ বছরের পর বছর অর্থ সংগ্রহ করেছেন। কেউ দিয়েছেন সাপ্তাহিক আয় থেকে কয়েক পাউন্ড, কেউ দিয়েছেন শ্রম, কেউ দিয়েছেন সময়। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ১৯৭৯ সালে শুরু হয় বর্তমান মসজিদের নির্মাণকাজ। প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ড ব্যয়ে চার একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই মসজিদ ১৯৮৪ সালের ১৮ মে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদ ছিল স্কটল্যান্ডের প্রথম বড় পরিকল্পিত মসজিদ। ইসলামী স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর স্কটিশ নির্মাণশৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধন। গম্বুজ আছে, খিলান আছে, আরাবেস্ক নকশা আছে, আছে প্রশস্ত অঙ্গন। আবার নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে গ্লাসগোর ঐতিহ্যবাহী লাল বেলেপাথরের রঙের সঙ্গে মিল রেখে লাল ইট ও টেরাকোটা। এই অনন্য স্থাপত্যের জন্য মসজিদটি হিস্টোরিক এনভায়রনমেন্ট স্কটল্যান্ডের ‘ক্যাটাগরি–এ’ মর্যাদাপ্রাপ্ত”
যা স্কটল্যান্ডের সর্বোচ্চ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক মর্যাদা।
বিশাল নামাজঘর। নরম কার্পেট। ঝাড়বাতির আলো। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করছেন। এখানে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। নারীদের জন্যও রয়েছে প্রায় পাঁচশো মানুষের পৃথক নামাজের ব্যবস্থা।
এখানে কোরআন শিক্ষা হয়, শিশুদের ইসলামী ক্লাস হয়, বিয়ে হয়, জানাজা হয়, আন্তধর্মীয় সংলাপ হয়, স্কুলের শিক্ষার্থীরা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আসে, দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য বিতরণ হয়, শরণার্থীদের সহায়তা দেওয়া হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য অমুসলিম দর্শনার্থীও এই মসজিদ ঘুরে যান। গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদ একটি পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি সেন্টার।
২০২২ সালের স্কটল্যান্ডের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ উনিশ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ। গ্লাসগো, এডিনবরা, ডান্ডি ও অ্যাবারডিনে তাঁদের বসবাস সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, আরব দেশ, আফ্রিকা ও ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলমানেরা স্কটল্যান্ডের সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
জুমার নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা হলো সিলেটের বাসিন্দা আবদুল করিমের সঙ্গে। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে গ্লাসগোতে আছেন। হেসে বললেন, ‘দেশের মসজিদ আর এই মসজিদের পরিবেশ আলাদা, সিজদার অনুভূতি একই। এই মসজিদ আমাদের শুধু নামাজের জায়গা নয়, প্রবাসে বেঁচে থাকার সাহসও দেয়।’
আরেক কোণে দেখা মিলল পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত তরুণ ইয়াসিরের। তিনি বললেন, ‘আমি এখানেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় বাবা হাত ধরে নিয়ে আসতেন। এখন আমি নিজের ছেলেকে নিয়ে আসি। একটা প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বিশ্বাস এভাবেই পৌঁছে যায়।’
কেউ প্রথম চাকরি পাওয়ার পর এখানে এসে শুকরিয়া আদায় করেছেন। কেউ সন্তানের জন্মের পর দোয়া করেছেন। কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে কেঁদেছেন। কেউ ঈদের নামাজ পড়ে দূরের বাংলাদেশের কথা ভেবে চোখ মুছেছেন। এই দেয়ালগুলো নীরব, ইতিহাসে ভরা। জুমার নামাজ শেষে আমরা কিছুক্ষণ মসজিদের আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আশরাফকে বললাম, ‘মনে আছে, ২০১৪ সালের ঈদের কথা?’ সে মৃদু হেসে বলল, “মনে থাকবে না কেন? সময় কত বদলে গেছে!’ হ্যাঁ, সময় বদলেছে।
অনেক মানুষ হারিয়ে গেছেন। নতুন মানুষ এসেছে। জীবনের পথ বদলেছে। কিন্তু গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদের মিনার একইভাবে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো আরও শত শত বছর পরও দাঁড়িয়ে থাকবে। তখনও কোনো বাংলাদেশি তরুণ প্রথমবারের মতো প্রবাসে এসে এই মসজিদে জুমার নামাজ পড়বে। হয়তো সেও দূরের দেশের কথা ভাববে। হয়তো নামাজ শেষে ফোন করবে মাকে।
তখনও এই মসজিদ নীরবে সাক্ষ্য দেবে— মানুষ,দেশ, ঠিকানা,সময় বদলালেও বিশ্বাসের পথ কখনো বদলায় না।