বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
মৃত্যু—একটি শব্দ, যার কথা মনে হলেই মানুষের হৃদয়ে নীরবতা নেমে আসে। এটি এমন এক অনিবার্য সত্য, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই মুক্ত নয়। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল—সবাইকে একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু ইসলাম মৃত্যুকে জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে অনন্ত আখিরাতের জীবনে প্রবেশের দ্বার হিসেবে বিবেচনা করে।
তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত, কখন মৃত্যু আসবে তা নয়; বরং কী অবস্থায় মৃত্যু আসবে। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আমাদের মৃত্যুর সময়ের কিছু বাস্তব অবস্থা, নেককার ও পাপীর ভিন্ন পরিণতি এবং উত্তম মৃত্যুর কয়েকটি আলামত সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছে। তবে এসব আলামতকে সবার জন্য অবধারিত লক্ষণ মনে করা সঠিক নয়। কারণ মৃত্যু কখন, কোথায় এবং কীভাবে হবে— এ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে।
আসুন, কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নিই—
মৃত্যু অবধারিত— প্রত্যেক প্রাণীকেই এ স্বাদ গ্রহণ করতে হবে
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ৫৭)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ...
‘প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেই-ই প্রকৃত সফল। আর দুনিয়ার জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৮৫)
১. নেককার মুমিন মৃত্যুর আগে জান্নাতের সুসংবাদ পান
যে ব্যক্তি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللّٰهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
‘যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’, অতঃপর তাতে অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে, ভয় পেয়ো না, দুঃখ কর না; তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।’ (সুরা ফুসসিলাত: আয়াত ৩০)
অন্যদিকে পাপাচারীদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন—
فَكَيْفَ إِذَا تَوَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ
‘তখন তাদের কী অবস্থা হবে, যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল ও পিঠে আঘাত করতে করতে প্রাণ বের করবে!’ (সুরা মুহাম্মাদ: আয়াত ২৭)
২. নেক আমলের মধ্যে মৃত্যু হওয়া সৌভাগ্যের লক্ষণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَرَادَ اللّٰهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে?
তিনি বললেন—
يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ مَوْتِهِ ثُمَّ يَقْبِضُهُ عَلَيْهِ
‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন মৃত্যুর আগে তাকে নেক আমলের তৌফিক দেন এবং সেই অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’ (তিরমিজি ২১৪২)
আরও ইরশাদ হয়েছে—
يُبْعَثُ كُلُّ عَبْدٍ عَلَى مَا مَاتَ عَلَيْهِ
‘প্রত্যেক মানুষকে যে অবস্থায় মৃত্যু দেওয়া হবে, কেয়ামতের দিন তাকে সেই অবস্থাতেই পুনরুত্থিত করা হবে।’ (মুসলিম ২৮৭৮)
৩. মৃত্যুর সময় কালিমা উচ্চারণ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
‘যার সর্বশেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু দাউদ ৩১১৬)
তাই মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে কোমলভাবে কালিমা স্মরণ করিয়ে দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন।
لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ
‘তোমরা তোমাদের মৃত্যুপথযাত্রীদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ স্মরণ করিয়ে দাও।’ (মুসলিম ৯১৬)
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ۖ ذٰلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ
‘মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই উপস্থিত হবে। এটাই সেই বিষয়, যেখান থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ (সুরা কাফ: আয়াত ১৯)
মা হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—
إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ
‘নিশ্চয়ই মৃত্যুর অনেক কষ্ট রয়েছে।’ (বুখারি ৬৫১০)
তবে নেককার মুমিনের জন্য আল্লাহ এই কঠিন মুহূর্তকে সহজ করে দেন এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেন।
৫. কপালে ঘাম নিয়ে মৃত্যু
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَوْتُ الْمُؤْمِنِ بِعَرَقِ الْجَبِينِ
‘মুমিনের মৃত্যু কপালে ঘাম নিয়ে হয়।’ (তিরমিজি ৯৮২, নাসাঈ ১৮২৯)
মুহাদ্দিসগণ এটিকে উত্তম মৃত্যুর একটি আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে প্রকাশ পাবে— এমন দাবি করা সঠিক নয়।
৬. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যু
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلَّا وَقَاهُ اللّٰهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ
‘যে মুসলিম জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখেন।’ (তিরমিজি ১০৭৪)
৭. শহীদের বিশেষ মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ ছাড়াও প্লেগে মৃত্যু, পেটের রোগে মৃত্যু, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারীদের শহীদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। (বুখারি ২৮২৯, মুসলিম ১৯১৪–১৯১৫)
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللّٰهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ
‘আল্লাহ বান্দার তওবা গ্রহণ করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়।’ (তিরমিজি ৩৫৩৭)
মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের হৃদয়বিদারক দৃশ্য
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ وَقِيلَ مَنْ ۜ رَاقٍ وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ
‘কখনো নয়! যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, বলা হবে—কে তাকে রক্ষা করবে? তখন সে নিশ্চিত বুঝবে যে এটাই বিদায়ের ক্ষণ। আর এক পা আরেক পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।’ (সুরা আল-কিয়ামাহ: আয়াত ২৬–৩০)
যেসব কুসংস্কার থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন
সমাজে প্রচলিত আছে—মৃত্যুর আগে নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখা, কাক ডাকা, সবাই ৪০ দিন আগে নিজের মৃত্যু টের পাওয়া, কিংবা প্রত্যেকে মৃত্যুর সময় ফেরেশতাকে দেখা—এসব ধারণার পক্ষে কুরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই এসব বিষয়ে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। মৃত্যুর সময়, স্থান ও পদ্ধতি একমাত্র আল্লাহই জানেন। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো কুসংস্কারে বিশ্বাস না করে প্রতিটি দিনকে নেক আমল, তাওবা, ইস্তিগফার ও আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করা।
মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত অথচ সবচেয়ে অজানা অধ্যায়। কখন, কোথায় এবং কীভাবে তা আসবে— এ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। তাই একজন সচেতন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত মৃত্যুর আলামত খোঁজা নয়; বরং এমন জীবন গড়ে তোলা, যাতে মৃত্যু এসে তাকে আল্লাহর আনুগত্য, ইমান ও নেক আমলের অবস্থায় পায়।
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়, তওবার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখে, মানুষের হক আদায় করে এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণে জীবন পরিচালনা করে, তার জন্য মৃত্যুই হবে অনন্ত শান্তি ও জান্নাতের পথে যাত্রার সূচনা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইমানের সঙ্গে, নেক আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত অবস্থায়, কালিমায়ে তাওহিদের সাক্ষ্য উচ্চারণ করে উত্তম মৃত্যু (হুসনুল খাতিমাহ) নসিব করুন এবং আখিরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।